কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় এক তরুণীকে ধর্ষণের পর তাঁর জন্ম নেওয়া নবজাতককে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, অভিযুক্ত যুবকের লোকজনই শিশুটিকে নিয়ে গেছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ১২ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ায় মা-ই সংসার সামলাচ্ছেন ওই তরুণীর। নানির চিকিৎসার জন্য মা যখন ঢাকায় অবস্থান করছিলেন, সেই সুযোগে ২১ বছর বয়সী ওই তরুণীকে ধর্ষণ করে একই গ্রামের এক যুবক। এই ঘটনার ফলে তরুণীটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। গত শুক্রবার রাতে চৌদ্দগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, সন্তান জন্মের পরপরই অভিযুক্ত যুবকের লোকজন নবজাতককে নিয়ে যায়।
ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, ধর্ষণের ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর মামলা না করতে এবং স্থানীয়ভাবে সালিসের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য তাঁদের ওপর চাপ দেওয়া হয়। অভিযুক্ত যুবকের বাবা প্রবাসে থাকায় তাঁর চাচা এই আপস-মীমাংসার চেষ্টা করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীর মায়ের অভিযোগ, তাঁর অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ সময় ঢাকার হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। সেই সময়ে বাড়িতে থাকা মেয়েকে ওই যুবক একাধিকবার ধর্ষণ করে। ভয়ে মেয়েটি শুরুতে কাউকে কিছু জানায়নি। পরবর্তীতে শারীরিক পরিবর্তন ও জটিলতা দেখে মা বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং অভিযুক্তের পরিবারকে জানান। তবে পরিবারের অভিযোগ, প্রথম দিকে অভিযুক্তের স্বজনরা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং উল্টো ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে নানা অপবাদ দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, একপর্যায়ে অভিযুক্ত যুবক ঘটনাটি স্বীকার করেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলে অভিযুক্তের পরিবার তা নাকচ করে দেয়। আইনি পদক্ষেপের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চাপ দেওয়া হয় বলে তাঁদের অভিযোগ।
পরিবারটির ভাষ্য অনুযায়ী, একই গ্রামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে ভুক্তভোগীর মাকে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ওই প্রভাবশালী ব্যক্তির বাড়িতে ভুক্তভোগীর মাকে একাধিকবার ডেকে নেওয়া হয় এবং সেখানে মীমাংসার চাপ দেওয়া হয়। ঘটনা প্রকাশ না করার জন্য ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের। তাঁরা জানান, স্থানীয় সালিসের মাধ্যমে অভিযুক্তের পরিবারের পক্ষ থেকে তিন লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নবজাতকের বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য, ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে শিশুটিকে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে তাঁরা শুনেছেন। শিশুটি বর্তমানে কোথায় আছে বা কোনো আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণা নেই।
ভুক্তভোগীর বড় বোন বলেন, ‘শুক্রবার রাতে আমার বোন একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু আমাদের পারিবারিক অবস্থা ও সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে নবজাতককে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। বোনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার হিসেবে তিন লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।’
সালিসে যুক্ত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রামের ওই প্রভাবশালী ব্যক্তি জানান, তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তির চাচার দোকানে বসে ছিলেন। অন্যরা বাড়ির ভেতরে গিয়ে সমঝোতা করেছেন বলে তিনি জেনেছেন। তবে সমঝোতার টাকার পরিমাণ এবং নবজাতক বিক্রির বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত ব্যক্তির চাচা এ বিষয়ে জানতে চাইলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমার সঙ্গে বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানি না। কারা কীভাবে কী করেছে, তা আপনারা খোঁজ নেন।’
আজ রোববার সন্ধ্যায় এ বিষয়ে জানতে চাইলে চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আরিফ হোছাইন বলেন, এ ঘটনায় কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ দায়ের করলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।