পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তবে এই নিন্দার পাশাপাশি তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে জানাজা পড়া ও লাশ দাফনের অধিকার খর্ব করার প্রসঙ্গটি সামনে এনেছেন। সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি পোস্টে এই প্রতিক্রিয়া জানান তিনি। উল্লেখ্য, নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বাধীন এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের অন্যতম একটি শরিক দল।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত শনিবার, যখন ৮৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যু হয়। তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। পিরোজপুরে তাঁকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় জামায়াত নেতা ও কর্মীরা পিরোজপুরে তাঁকে দাফন না করার দাবি জানিয়ে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নেন। শেষ পর্যন্ত শনিবার রাতে পিরোজপুর সদর উপজেলার চিতলিয়া গ্রামে তাঁর নিজ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। দাফন প্রক্রিয়ায় তাঁর পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।
ফেসবুক পোস্টে নাহিদ ইসলাম লিখেছেন, ‘জানাজা পড়ার অধিকার, লাশ দাফনের অধিকার যেকোনো মানুষের ন্যূনতম মানবিক অধিকার, ধর্মীয় অধিকার। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে এই ন্যূনতম অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা এই দৃশ্য আবার দেখতে চাই না। মুজিববাদী ফ্যাসিস্টরা শহীদ মিনারে পিয়াস করিম ও আল মাহমুদের লাশ আনতে দেয়নি, সাধারণ জনগণকে শ্রদ্ধা জানাতে দেয়নি। বিরোধী দলের অনেক নেতার জানাজা ঢাকায় করতে দেওয়া হয়নি।’
এনসিপি আহ্বায়ক তাঁর পোস্টে আরও উল্লেখ করেন, ‘কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পরে ঢাকায় রক্ষীবাহিনীর নেতা ফ্যাসিস্ট তোফায়েলের জানাজা হয়েছে। আমার নিজ এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা এ কে এম রহমতুল্লাহর জানাজা হয়েছে। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী শোক প্রকাশও হয়েছে। ফ্যাসিস্টদের মানবাধিকারের পক্ষেও আমরা কথা বলেছি এবং বলব। কারণ, শত্রুর সঙ্গে আমাদের ইনসাফ করা শিখতে হবে।’
মানবাধিকার কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলে নাহিদ ইসলাম লেখেন, ‘আজ অনেকে মানবাধিকারের কথা বলছেন। এটা ভালো। তবে ১৬ বছর অনেকেই বলেননি। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়ের পর সারা দেশে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটেছিল, তখন ঢাকা শহরের বহু মানবাধিকারকর্মী চুপ ছিলেন। মানবাধিকারের প্রশ্ন এলে সেসব হত্যার বিচারও হতে হবে।’
পোস্টের শেষাংশে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা লাশের ওপরে মুজিববাদীদের নৃত্য-উল্লাস দেখেছি, কবর ভাঙচুরের ঘটনা দেখেছি এবং দেখেছি জানাজা পড়তে না দেওয়াটাকে কীভাবে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত করা হয়েছিল। আমরা এখনো দেখছি কীভাবে প্রতিনিয়ত শহীদ ওসমান হাদীর কবর উৎখাত করার সম্মতি উৎপাদন করা হচ্ছে; কিন্তু এতকিছুর পরও আমরা ফ্যাসিস্টদের পথ অনুসরণ করতে পারি না।
ফ্যাসিবাদের বিপরীতে আমাদের ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাই পিরোজপুরে লাশ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় নিন্দা জানাই। আমরা সব নাগরিকের মানবিক মর্যাদা ও মানবাধিকারের পক্ষে থাকব।’