পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বাধা দেওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চিকিৎসক ও তরুণ রাজনীতিক তাসনিম জারা। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?’
আজ সোমবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি পোস্টে তাসনিম জারা এসব কথা উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য প্রদানকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭) গত শনিবার মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে পিরোজপুরে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। জামায়াতের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা পিরোজপুরে তাঁকে দাফন না করার দাবি জানান এবং শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। অবশেষে শনিবার দিবাগত রাতে পিরোজপুর সদর উপজেলার চিতলিয়া গ্রামে নিজ বাড়ির কবরস্থানে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। দাফন প্রক্রিয়ায় তাঁর পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।
মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার প্রসঙ্গটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন তাসনিম জারা। তিনি তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, এ দেশের সমাজে কেউ মারা গেলে কবর খুঁড়তে কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে পাড়ার ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই চলে আসে। কেউ বাঁশ কেটে আনে, কেউ চাটাই। মৃত মানুষের দাফনে দেরি করতে নেই, এটা শুনেই বড় হয়েছেন তিনি। শনিবার সকাল ১০টার দিকে ৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারী মারা যান। সারা দিন তাঁর পরিবারকে মরদেহ নিয়ে উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করতে হয়েছে। জামায়াতের স্থানীয় নেতা–কর্মীরা মিছিল করেছেন। মাইকে আর ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন, পিরোজপুরে তাঁকে দাফন করতে দেওয়া হবে না। অবশেষে গভীর রাতে পুলিশ পাহারায় তাঁর দাফন হয়েছে। প্রশাসনের লোকজন ও পরিবারের বাইরের আর কেউ সেখানে ছিলেন না।
তাসনিম জারা আরও লিখেছেন, মানিক পশারীর দাফন পিরোজপুরে হতে দেওয়া হবে না—এই কথাটা জামায়াতের নেতা-কর্মীরা এমনভাবে বলেন যেন, এই মাটির দলিল তাঁদের নামে লেখা। যেন একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই অনুমতিও তাঁদের কাছ থেকে নিতে হবে। তাঁদের একসময় একই ভাষায় বলা হতো ‘জামাত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’। এটা যে কেমন অন্যায় কথা, সেটা তাঁদের ভালোই জানার কথা। কিন্তু ক্ষমতা একটু হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই, বিরোধীদলে থাকতেই, সেটা তাঁরা ভুলে গেছেন।
তিনি তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সেই দলের নেতা–কর্মীরা আজ ঠিক করে দিতে চাইছেন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন আর কার কবর কোথায় হবে।
জামায়াত নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, সঠিক প্রক্রিয়া ও মানবিক মর্যাদার কথা বললেও অন্যদের ক্ষেত্রে তারা তা করতে নারাজ বলে অভিযোগ করেন তাসনিম জারা। জামায়াতের নেতা-কর্মীদের সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘ভোটের আগে আর বক্তৃতায় ইনসাফের কথা বলেন। কিন্তু একজন মৃত মানুষের সাথে ও তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে এমন আচরণ করেন। বিরোধী দলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?’
অন্যদিকে, পিরোজপুরের এই ঘটনায় জামায়াতের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের।
গতকাল রাতে এক ফেসবুক পোস্টে আব্দুল কাদের লিখেছেন, এমন অমানবিক ঘটনার পরে এনসিপি সাংগঠনিকভাবে একেবারে নির্বিকার, নির্লিপ্ত ছিল। আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দূরে থাক, কোনো একজন নেতা সোশ্যাল মিডিয়ায় পর্যন্ত একটা টুঁ শব্দ করেননি। মৃত ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। এ ক্ষেত্রে এনসিপি তাদের শরিক দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের পক্ষ নিয়েছে। মবকে নীরব সমর্থন দিয়েছে। অথচ তারা নাকি মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেন। এই তার নমুনা!