আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী এবং রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মানিক পশারীর মৃত্যুর পর পিরোজপুরে তার নিজ বাড়িতে এখন চরম নীরবতা। বাড়িতে লোকজনের আনাগোনা নেই বললেই চলে। তবে তার দাফন এবং জানাজা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যদের দেওয়া বক্তব্যে স্পষ্ট ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

রোববার (২৫ অক্টোবর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে মানিক পশারীর বাড়িতে গিয়ে এই পরিস্থিতি দেখা যায়।

পরিবারের সদস্য এবং প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থানকালে ৮৭ বছর বয়সি মানিক পশারীর মৃত্যু হয়। ওই দিন দুপুরে তার মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নিয়ে আসা হলে স্থানীয়দের তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন স্বজনরা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ মরদেহটি সেখান থেকে সরিয়ে পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যায়। বিকেল ৫টার দিকে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় এবং এরপর মরদেহের নিরাপত্তায় সদর থানা পুলিশ দায়িত্ব পালন করে।

পরিবারের সদস্যদের দাবি অনুযায়ী, রাতে মরদেহটি বাড়িতে নেওয়া হয়। এরপর পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই কবর খুঁড়ে রাত ২টার দিকে দাফন সম্পন্ন করেন। দাফনের সময় তার স্ত্রী, মেয়ে ও দুই বোন উপস্থিত ছিলেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ দাবি করেন, তারা দাফনের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। পিরোজপুরে কোনো জানাজা হয়নি বলেও জানান কয়েকজন প্রতিবেশী। অন্যদিকে, পরিবারের দাবি অনুযায়ী টুঙ্গিপাড়ায় জানাজা সম্পন্ন হয়েছিল।

মানিক পশারীর বোন হেনা পশারী বলেন, ‘শনিবার ভোর ৬টার দিকে শুনতে পাই, আমার ভাই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। পরে সকাল ১০টার দিকে তার মৃত্যুর খবর পাই। এরপর মরদেহ পিরোজপুরে আনা হয়। সন্ধ্যায় পরিবারের লোকজন মিলে কবর খুঁড়ছিলাম। সন্ধ্যার পর দেখি, কবরে মাটি দিয়ে কারা যেন ভরাট করে রেখেছে। রাতে শুনতে পাই, কিছু মানুষ মানিক পশারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে মিছিল করছে।’

তিনি আরও জানান, ‘রাত ১২টার দিকে আমরা দুই বোন কবর খুঁড়ি। পরে রাত ২টার দিকে আমার ভাইয়ের স্ত্রী ও মেয়েসহ পুলিশ মরদেহ নিয়ে আসে। এরপর দাফন করা হয়। দাফনের সময় এলাকার কোনো লোকজন ছিলেন না। দাফনের পর কোনো ধরনের সমস্যা হয়নি।’

সাঈদী প্রসঙ্গে হেনা পশারী বলেন, ‘সাঈদী সাহেব একজন আল্লাহর ওলি ছিলেন। আমার বড় ভাই কেন এই কাজগুলো করেছেন, তা তিনি নিজেই জানেন। আমরা কখনো তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিনি।’

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মালেক খান জানান, ৫ আগস্টের পর থেকে মানিক পশারী বাড়িতে ছিলেন না। রাতে দাফনের সময় তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না এবং সকালে দাফনের খবর পান।

আরেক প্রতিবেশী সাফিয়া বেগম বলেন, ‘এখানে কোনো জানাজা হয়নি। শুনেছি, গোপালগঞ্জে জানাজা হয়েছে। রাতে বাড়িতে মরদেহ এনে তার স্ত্রী, মেয়ে ও বোনেরা মিলে দাফন করেছেন। এলাকার কোনো লোকজন সেখানে ছিলেন না।’

উল্লেখ্য, মানিক পশারী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম সাক্ষী ছিলেন। এছাড়া পিরোজপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে করা মামলার বাদীও ছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ওই মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ হিসেবে গ্রহণ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দাফনে সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে জামায়াতে ইসলামী বা এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা কোনো বাধা সৃষ্টি করেননি। বরং সদর থানা পুলিশকে সহযোগিতা করে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। তার ভাষ্য, জামায়াতে ইসলামী লাশের রাজনীতি করে না।

টুঙ্গিপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আইয়ুব আলী জানান, মানিক পশারীর জানাজা হয়েছে কি না, তা তার জানা নেই। তার ভাষ্য, টুঙ্গিপাড়ায় এ বিষয়ে কোনো কার্যক্রম হয়নি। সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা বিষয়টি সমন্বয় করে থাকেন।

পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, পুলিশের উপস্থিতিতে মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এবং শান্তিপূর্ণভাবে দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর মানিক পশারী যশোর ও গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন। গত দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর গোপালগঞ্জে তার মৃত্যু হয়।