আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মানবতা বিরোধী মামলার বাদী এবং রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান সাক্ষী মানিক পশারীর মরদেহ অবশেষে দাফন করা হয়েছে। জামায়াত নেতাকর্মী ও স্থানীয়দের তীব্র বিরোধিতার মুখে দীর্ঘ ১৭ ঘণ্টা অপেক্ষার পর গভীর রাতে পরিবারের নারী সদস্যদের খোঁড়া কবরে তাকে সমাহিত করা হয়। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাত ২টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে মানিক পশারীর বাড়িতে পুলিশি সহায়তায় দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় শনিবার সকাল ১০টার দিকে, যখন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় পলাতক থাকা অবস্থায় মানিক পশারীর মৃত্যু হয়। ওইদিন দুপুর ১২টার দিকে মরদেহটি পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নিয়ে আসা হলে সেখানে উপস্থিত জেলা জামায়াতের নেতাকর্মী ও স্থানীয়দের প্রবল তোপের মুখে পড়েন স্বজনরা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশের সহায়তায় মরদেহটি সরিয়ে পুলিশ লাইনসে নেওয়া হয়। বিকেল ৫টার দিকে সেখানে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় এবং এরপর থেকে সদর থানা পুলিশের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় মরদেহটি রাখা হয়।
পরবর্তীতে রাত ১টার দিকে সদর থানা পুলিশ জেলা জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সহযোগিতায় মরদেহটি তার বাড়িতে পৌঁছে দেয়। এরপর মানিক পশারীর স্ত্রী, মেয়ে ও বোনসহ পরিবারের নারী সদস্যরা মিলে কবর খনন করেন এবং রাত ২টার দিকে দাফন সম্পন্ন হয়। এই সময় সেখানে কিছু স্থানীয় ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
পরিবারের করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানান মানিক পশারীর বোন হেনা পশারী। তিনি বলেন, “শনিবার ভোর ৬টার দিকে শুনতে পাই আমার ভাই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পরে শুনতে পাই সকাল ১০টায় সে মারা গেছে। এরপর মরদেহ পিরোজপুরে আনা হয়। এরপর আমাদের দুইবার কবর খুঁড়তে হয়েছে। সন্ধ্যায় আমরা পরিবারের লোকজন মিলে কবর খুঁড়ছিলাম। সন্ধ্যার পর দেখি কবরে মাটি দিয়ে কারা যেন ভরাট করি দিছে। রাতে শুনতে পাই কিছু মানুষ মানিক পশারীর নামে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে মিছিল করছে। পরে রাত ১২টায় আবারও কবর খুঁড়ে রাত ১টার দিকে তাকে দাফন করা হয়।”
অন্যদিকে, দাফন প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক। তিনি দাবি করেন, মানিক পশারীর লাশ দাফনে পিরোজপুর জেলা জায়ামাতের নেতা এবং অঙ্গ সংগঠনের কোনো নেতা বাঁধা সৃষ্টি করেনি। তার ভাষায়, “জামায়াতে ইসলামীর নেতারা লাশের রাজনীতি করে না। তাই পিরোজপুর সদর থানা পুলিশকে পুরোপুরি সহায়তা করে লাশ দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।”
পুরো বিষয়টি নিশ্চিত করে পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম জানান, পুলিশের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মানিক পশারীর লাশ দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। বর্তমানে কবরের পাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
উল্লেখ্য, ৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৭ নং ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দা। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতা আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী এবং রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান সাক্ষী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি যশোরে এবং পরবর্তীতে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তার মেয়ের জামাইয়ের আশ্রয়ে অবস্থান করছিলেন। গত দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর তার মৃত্যু হয়।