মানিক পশারীর লাশ দাফন কিংবা জানাজায় কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র মাসুম সাঈদী। তার মতে, সাধারণ মানুষের আপত্তি ছিল কেবল একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করার বিষয়ে, যাকে তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অবমাননা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাত ১১টায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে দেওয়া একটি পোস্টের মাধ্যমে তিনি এই বিষয়টি পরিষ্কার করেন।
ফেসবুক পোস্টে মাসুম সাঈদী লিখেছেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শহীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বিতর্কিত ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পোষ্য ও সুবিধাভোগী দালাল কুখ্যাত মানিক পশারী আজ দিনের কোনো এক সময় গোপালগঞ্জের একটি হাসপাতালে মারা যায়। মৃত্যুর পর তাকে পিরোজপুরে আনা হয় এবং তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানের চেষ্টা করা হয়। জনগণ বিষয়টি জানতে পেরে তাকে কথিত ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানে বাধা প্রদান করে এবং কুখ্যাত মানিক পশারী যে মুক্তিযোদ্ধা নন, তা প্রশাসনকে অবহিত করেন। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিনি ‘গেজেটপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা!’ এরপরও জনগণ একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার প্রদানে বাধা প্রদান করে।’
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিষয়ে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘জনগণকে শান্ত করেছি, ধৈর্যধারণ করতে বলেছি। অতীতে আওয়ামী লীগ যেসব অন্যায় করেছে সেসব অন্যায় কোনোভাবেই যেন আমাদের দ্বারা না হয়, সে বিষয়ে জনগণকে বুঝিয়েছি। আমি বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি (বরিশাল রেঞ্জ) থেকে শুরু করে পিরোজপুর প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আমি আমার অবস্থান থেকে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলগত অবস্থান থেকে উভয়ে একযোগে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বরাবরই নিয়ন্ত্রণে ছিল, তবে জনগণের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ সত্যিই খুব কঠিন ছিল।’
মানিক পশারীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা দাফন নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি ছিল না বলে জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘আপত্তি ছিল একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান নিয়ে। যদিও প্রশাসন মিথ্যাচার ও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রাপ্ত একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে গোপনে গার্ড অব অনার প্রদান করেছে। অবশ্যই ঘটনাটি এ দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের অপমান ও মহান স্বাধীনতার অবমাননা এবং দেশের আইনি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি চরম এক উপহাস বলে মনে করছি।’
মাসুম সাঈদীর মতে, যে ব্যক্তি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জেরায় নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি মুক্তিযোদ্ধা নন, তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া এবং বছরের পর বছর সরকারি ভাতা ভোগ করতে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা এবং ডিও লেটার জালিয়াতির বিষয়ে তিনি বিস্তারিত লিখে জানান, ‘সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হলো যখন মানিক পশারীকে ট্রাইব্যুনালের আইনজীবী প্রশ্ন করেন যে, ‘আপনি মুক্তিযোদ্ধা কিনা?’ তখন সে স্পষ্ট করেই বলেছিল, ‘আমি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করিনি।’
ট্রাইবুনালে তার বক্তব্য আমি এখানে হুবহু তুলে ধরছি, ‘আমি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই, তবে সহযোগিতা করেছি। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছি। এই জন্য বর্তমান এমপি একেএমএ আওয়াল সাহেব আমার নামে একটি ডিও লেটার দিয়েছে আমার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। আমি পিরোজপুরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা করার পরে না আগে আমার ঐ ডিও লেটার দিয়েছে তা আমার স্মরন নাই।’
মানিক পশারী অকপটে স্বীকার করেছেন যে তিনি মুক্তিযোদ্ধা নন বলে মাসুম সাঈদী দাবি করেন। তিনি আরও লেখেন, ‘এই মামলায় সাক্ষী হিসেবে আসার আগে তৎকালীন আওয়ামী দোসর কুখ্যাত এমপি আউয়াল তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর জন্য একটি ডিও লেটার দিয়েছিল। অর্থাৎ স্রেফ মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর অপচেষ্টা করা হয়েছিল।’
পোস্টের শেষ অংশে মাসুম সাঈদী বেশ কিছু দাবি ও প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তার দাবিগুলো হলো—
১. একটি দেশের সর্বোচ্চ বীরত্ব ও সম্মানের জায়গা হলো ‘মুক্তিযোদ্ধা’ খেতাব। মানিক পশারীর মতো একজন কুখ্যাত ও স্বঘোষিত অ-মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রমাণিত মিথ্যাবাদীকে কারা গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা বানাল? কোন কুচক্রী মহল তাকে রাষ্ট্রের করের টাকায় বছরের পর বছর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাওয়ার সুযোগ করে দিল?
২. মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাকে অবৈধভাবে ভাতা পাইয়ে দেওয়ার পেছনে যে সমস্ত কর্মকর্তা, যাচাই-বাছাই কমিটি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তি জড়িত ছিল, তাদের অবিলম্বে খুঁজে বের করতে হবে। রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. একজন ভুয়া ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যয়ন করে ডিও লেটার দেওয়া এবং মিথ্যা সাক্ষীর বিনিময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম উঠানোর অপরাধে সাবেক অবৈধ এমপি একেএমএ আউয়ালের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. একই সঙ্গে মানিক পশারীর নাম অনতিবিলম্বে মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট থেকে বাতিল করতে হবে এবং তাকে দেওয়া সমস্ত রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও ভাতা চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
মিথ্যা ও জালিয়াতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কোনো অপশক্তি চিরদিন সত্যকে ধামাচাপা দিতে পারে না বলে উল্লেখ করে মাসুম সাঈদী বলেন, মানিক পশারী ও তার পৃষ্ঠপোষকদের এই জালিয়াতি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কলঙ্কিত করেছে। তিনি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।