তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বানানোর পাঁয়তারা করছে বিএনপি। দলটিকে এই পরিকল্পনা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আজ সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মুন্সিগঞ্জে এনসিপি আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। জেলার একটি পার্টি সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই সভায় এনসিপির এক বিবৃতিতে এসব বিষয় জানানো হয়েছে।
সভায় নাহিদ ইসলাম বলেন, “বিএনপি অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে ষড়যন্ত্র করেছে। ২০০৬ সালে নিজেদের লোক বসানোর চেষ্টা করেছে। তারা তখন সফল হয়নি। আবারও তারা পাঁয়তারা করছে কীভাবে নিজেদের লোককে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করা যায়। এটার মানে খুবই সুস্পষ্ট যে বিএনপি আগামী নির্বাচন কোনোভাবেই সুষ্ঠুভাবে হতে দিবে না।”
সরকারকে সতর্ক করে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, “আমরা স্পষ্টভাবে বলছি, এ পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। র্যাঙ্ক চয়েস সিস্টেম আমরা প্রস্তাবনা দিয়েছিলাম তার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলা বাস্তবায়ন করতে হবে।”
অন্যদিকে, ডিসেম্বরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি পলাতক শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দেশে আসবেন বলে যে কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ যেসব তৎপরতা দেখাচ্ছে, সেটিকে তাঁর ব্যক্তিগত তৎপরতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং একে কূটনৈতিক তৎপরতা হিসেবে দেখতে হবে। তাঁর মতে, বাংলাদেশকে নানামুখী চাপ দেওয়ার জন্য ভারত এই নিষিদ্ধ দলটিকে ব্যবহার করে অপতৎপরতা চালাচ্ছে।
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন আনতে হলে একটি গণপরিষদ অথবা সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রয়োজন। কেবল সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, গণভোটে শত শত মানুষ যে রায় দিয়েছেন, সেই রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে বিএনপি একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিএনপি ইতিমধ্যে তাঁদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ৩১ দফার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দফা এবং জুলাই শর্তের গুরুত্বপূর্ণ কিছু শর্ত লঙ্ঘন করেছে।
বিএনপির অধীনে স্থানীয় সরকারের সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি। এবং এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, এটা আমাদের কাছে মনে হচ্ছে না। কারণ নির্বাচন কমিশনে বিএনপি অলরেডি একটি লোক ঢুকিয়েছে এবং আপনারা দেখেছেন যে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী তিনি নিজে এখন প্রার্থী ঘোষণা করছেন।”
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “আমরা একটা কথা বলতে চাই যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা কোনো ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং মেনে নিব না। এই ধরনের পরিকল্পনা যদি থাকে, তাহলে বিএনপি আসলে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবে না।”
সারা দেশে বিরোধী দল ও ভিন্ন মতের ওপর দমন-পীড়ন চলছে বলেও দাবি করেন এনসিপি আহ্বায়ক। তিনি জানান, শুধুমাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত দেওয়ার কারণে প্রায় ২২ জন মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “গতকালকে একটা নিউজ দেখলাম যে নরসিংদীতে একজন নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওই নারী সরকারের সমালোচনা করেছেন, “কেন যে বিএনপিকে ভোট দিলাম” বা এই ধরনের একটা কথা বলেছেন। অর্থাৎ মানুষের যে ক্ষোভ, সেটা কিন্তু মানুষ প্রকাশ করতে শুরু করেছে এবং মানুষের মুখ বন্ধ করার জন্য তারা সাইবার সিকিউরিটি, সাইবার নিরাপত্তা আইন এগুলা নতুন করে সংশোধন করছে, সাংবাদিকদের হাতে শিকল পরানো যায়, সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করা যায়, সাংবাদিকদের বিভিন্ন জায়গায় নির্যাতন-নিপীড়ন করছে।”
বিএনপি নিজেদের যে পরিচয় দিচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, “বিএনপি নিজেদেরকে যতই শিশু সরকার বলুক, আমরা মনে করি, এই শিশুকে এখন শাসন করার সময় এসেছে। তো সেই জায়গা থেকে আমরা সারা দেশব্যাপী আমাদের বিক্ষোভ কর্মসূচিগুলো চলমান থাকবে।”
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস এখন দেশের সর্বত্র বিদ্যমান এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে। সমতল থেকে পাহাড়—কোথাও মানুষের নিরাপত্তা নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, কিন্তু তিনি সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়ে ব্যস্ত। একইভাবে জ্বালানি খাতের যে বিপর্যয় এসেছে, তা জ্বালানিমন্ত্রী কোনোভাবেই এড়াতে পারছেন না।
মুন্সিগঞ্জের স্থানীয় সমস্যাগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, “মুন্সিগঞ্জের কিছু সমস্যার কথা আমরা অলরেডি শুনেছি। এখানে নদীভাঙন এবং বালু উত্তোলন হচ্ছে অবৈধভাবে। এখানেও চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ক্ষমতাশীল দলের শেল্টারই (প্রশ্রয়ে) করছে তারা, ক্ষমতাশীল দলের শেল্টারই আছে। প্রশাসনকেও বলব যে তারা যেন নিরপেক্ষভাবে কাজ করে।”
পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে নাহিদ ইসলামের মতে, এই সরকার পুলিশকে সক্রিয় করতে পারছে না। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ বিভিন্ন জায়গায় যে সক্রিয়তা দেখাচ্ছে, তা বিএনপির আশ্রয়-প্রশ্রয়েই সম্ভব হচ্ছে।
উক্ত সভায় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল আমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, আলী আহসান জুনায়েদ, জেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম, ঢাকা উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল হায়দার, সহসাংগঠনিক সম্পাদক শওকত আলীসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় দলের সাংগঠনিক অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।