পার্থিব সম্পদ অর্জন ও তা ধরে রাখার জন্য মানুষ প্রতিনিয়ত কঠোর পরিশ্রম করে থাকে। তবে পরকালের প্রতি অবিচল বিশ্বাস মানুষকে মাঝে মাঝে এমন সব সাহসী ও অনন্য সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করে, যা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। সাহাবি আবু দাহদাহ (রা.)-এর জীবন থেকে পাওয়া একটি ঘটনা ঠিক তেমনই এক বিশ্বাসের প্রতিফলন, যেখানে তিনি জান্নাতের আশায় নিজের পুরো খেজুরবাগানটি উৎসর্গ করেছিলেন।

সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে অভিযোগ জানান, অন্য এক ব্যক্তির একটি খেজুরগাছ তাঁর বাগানের ভেতরে অবস্থিত। ওই গাছটির উপস্থিতির কারণে তিনি তাঁর বাগানের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করতে পারছেন না। এই সমস্যার সমাধানে তিনি নবীজি (সা.)-কে অনুরোধ করেন, যেন তিনি গাছের মালিকের সাথে কথা বলে গাছটি তাঁকে দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

বিষয়টি জানতে পেরে রাসুল (সা.) গাছের মালিককে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে অনুরোধ করলেন যেন তিনি গাছটি ওই ব্যক্তিকে দিয়ে দেন। বিনিময়ে তিনি জান্নাতে একটি খেজুরগাছ পাবেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই ব্যক্তি জান্নাতের এই লোভনীয় প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও তা প্রত্যাখ্যান করেন।

গাছের মালিকের এই অস্বীকৃতির কথা জানতে পেরে সাহাবি আবু দাহদাহ (রা.) এগিয়ে আসেন। তিনি ওই ব্যক্তির কাছে প্রস্তাব করেন যে, তিনি তাঁর পুরো একটি বাগানের বিনিময়ে ওই একটি খেজুরগাছটি কিনে নেবেন। এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে লোকটি গাছটি বিক্রি করেন।

নিজের বাগান বুঝিয়ে দিয়ে আবু দাহদাহ (রা.) গাছটি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি রাসুল (সা.)-এর কাছে গিয়ে জানান যে, একটি বাগানের বিনিময়ে তিনি গাছটি কিনেছেন এবং এখন সেই প্রাচীর নির্মাণকারী ব্যক্তিকে গাছটি দিয়ে দিতে চান।

আবু দাহদাহ (রা.)-এর এই নিঃস্বার্থ সিদ্ধান্তের মূলে ছিল পরকালের প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং আর্তমানবতার সেবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তিনি দুনিয়ার সম্পদকে চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করেননি, বরং একে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ-তাআলা ইরশাদ করেছেন, “তোমরা কখনোই পুণ্য অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় করো। আর তোমরা যা কিছুই ব্যয় করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯২)। এই আয়াতের মর্মার্থ হলো প্রিয় সম্পদ ত্যাগের মাধ্যমেই প্রকৃত পুণ্য অর্জন সম্ভব, আর আবু দাহদাহ (রা.)-এর এই ঘটনাটি সেই ঐশ্বরিক নীতির এক বাস্তব উদাহরণ।

আবু দাহদাহ (রা.)-এর এই মহানুভবতার কথা শুনে রাসুল (সা.) অত্যন্ত খুশি হন এবং বলেন, “আবু দাহদাহর জন্য বেহেশতে কত ঝুলন্ত ফলভর্তি খেজুরের ছড়া রয়েছে!” নবীজি (সা.) এই কথাটি একাধিকবার ব্যক্ত করেছিলেন। একটি সাধারণ খেজুরগাছের বিনিময়ে নিজের পুরো বাগান ছেড়ে দেওয়ার প্রতিদান হিসেবে জান্নাতে খেজুরের কাঁদির এই সুসংবাদ ছিল আবু দাহদাহ (রা.)-এর জন্য এক অনন্য প্রাপ্তি।

বাগানটি হস্তান্তরের পর আবু দাহদাহ (রা.) তাঁর স্ত্রীর কাছে গিয়ে বলেন, “হে উম্মে দাহদাহ, বাগান থেকে বেরিয়ে এসো। আমি এটি বেহেশতের একটি খেজুরগাছের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছি।”

স্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ছিল আরও বিস্ময়কর। তিনি উত্তরে বললেন, “নিশ্চয়ই ব্যবসা লাভজনক হয়েছে।”

দাম্পত্য জীবনে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর অনেক পথ থাকে, তবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নেওয়া নেক কাজে সহযোগিতা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর জীবনবোধ। স্বামীর সিদ্ধান্তে তাঁদের বসবাসের বাগানটি হাতছাড়া হয়ে গেলেও স্ত্রী সেটিকে ক্ষতি হিসেবে দেখেননি। বরং জান্নাতের প্রতিদানের আশায় সম্পদ বিনিময়কে তিনি একটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আবু দাহদাহ (রা.)-এর স্ত্রী প্রমাণ করেছেন যে, ঈমানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পরিবারে দুনিয়াবী প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনেক বেশি গুরুত্ব পায়।

সাহাবি আবু দাহদাহ (রা.)-এর এই ঘটনা আমাদের এই শিক্ষা দেয় না যে সম্পদ পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে, বরং এটি শেখায় যে সম্পদ যেন মানুষের কল্যাণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। সামর্থ্য অনুযায়ী দান করা এবং নেক কাজে অগ্রণী হওয়া একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

আল্লাহ-তাআলা জান্নাতের বিনিময়ে মুমিনদের জীবন ও সম্পদ গ্রহণ করার কথা ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাঁদের জীবন ও সম্পদ কিনে নিয়েছেন, এর বিনিময়ে তাঁদের জন্য রয়েছে বেহেশত।” (সুরা তওবাহ, আয়াত: ১১১)। আল্লাহর পথে জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করার এই মহান মর্যাদার এক হৃদয়স্পর্শী দৃষ্টান্ত হলো আবু দাহদাহ (রা.)-এর এই ঘটনা।

সূত্র: মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১২৪৮২; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৭১৫৯

নাহাদি সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক
[email protected]