রোববার সিডনি অপেরা হাউস প্রাঙ্গণে দেখা গেল এক অন্যরকম ভিড়ের দৃশ্য। কেউ এসেছেন পরিবার ও পরিজনদের নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান উপভোগ করতে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে সেলফি তুলে মুহূর্তগুলো ধরে রাখছেন। এই বিশ্বখ্যাত স্থাপত্যের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন অসংখ্য মানুষ। ২৫ অক্টোবর বিশ্ব অপেরা দিবসের কথা মাথায় রেখে সেখানে গিয়ে দেখা যায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। দর্শনার্থীদের নিরন্তর আসা-যাওয়া এবং সংগীতের নান্দনিক আয়োজনে পরিচিত এই অপেরা হাউস যেন এক নতুন প্রাণ খুঁজে পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে অনেকের কাছেই অপেরা বলতেই সিডনি অপেরা হাউসের ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠলেও, প্রকৃতপক্ষে এই মঞ্চশিল্পের জন্ম হয়েছিল ষোড়শ শতকের শেষভাগে ইতালির ফ্লোরেন্সে। সেই শিল্পকে উদ্‌যাপনের বিশেষ দিনে সুর আর উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল সিডনির এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিও।

সিডনি অপেরা হাউসের জোয়ান সাদারল্যান্ড থিয়েটারে অপেরা অস্ট্রেলিয়ার বিশেষ আয়োজনে পরিবেশিত হয় সংগীতানুষ্ঠান ‘গ্রেট অপেরা হিটস’। এই অনুষ্ঠানে শিল্পীরা পুচিনি, ভের্দি, রসিনি ও বিজের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বিখ্যাত গানগুলো পরিবেশন করেন। এর পাশাপাশি কনসার্ট হলে মঞ্চস্থ করা হয় বহুল জনপ্রিয় সংগীতনাট্য ‘মাই ফেয়ার লেডি’।

মিলনায়তনের ভেতরে সুরের মূর্ছনা আর বাইরে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়—এই দুইয়ের সমন্বয়ে পুরো দিনের আয়োজনটি জমে ওঠে। আয়োজকদের একজন (যিনি নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি) জানান, ব্রডওয়েতে প্রথম মঞ্চস্থ হওয়ার ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সিডনি অপেরা হাউসে ‘মাই ফেয়ার লেডি’র এই বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে। এই নাটকের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ফুল বিক্রেতা এলাইজা ডুলিটলের জীবন পরিবর্তনের গল্প। এলাইজা চরিত্রে অভিনয় করেছেন ক্লেয়ার লায়ন এবং অধ্যাপক হেনরি হিগিনসের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ন্যাথানিয়েল পার্কার। পুরো প্রযোজনাটি সাজানো হয়েছে জুলি অ্যান্ড্রুজের নির্দেশনায় ২০১৬ সালে মঞ্চে আসা অস্ট্রেলীয় সংস্করণের ওপর ভিত্তি করে। এতে ‘আই কুড হ্যাভ ড্যান্সড অল নাইট’ ও ‘উডন্ট ইট বি লাভারলি?’–এর মতো অত্যন্ত পরিচিত গানগুলো রয়েছে। জানা গেছে, এই সংগীতনাট্যটির প্রদর্শনী চলবে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত।

বিশ্বখ্যাত দুই সুরকার—ফ্রান্সের জর্জেস বিজে এবং অস্ট্রিয়ার দ্বিতীয় জোহান স্ট্রসের জন্মদিন স্মরণে প্রতি বছর ২৫ অক্টোবর বিশ্ব অপেরা দিবস পালিত হয়। ২০১৮ সালে স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অপেরা ফোরামের আলোচনার সূত্র ধরে ২০১৯ সাল থেকে যৌথভাবে দিবসটি পালন শুরু করে অপেরা আমেরিকা, অপেরা ইউরোপা ও অপেরা লাতিনো-আমেরিকা। নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে অপেরাকে পৌঁছে দেওয়া এবং এই শিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি করাই এই দিবসের মূল লক্ষ্য। অপেরার গল্পগুলোতে ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, আনন্দ কিংবা বেদনার মতো চিরচেনা মানবিক অনুভূতিগুলো ফুটে ওঠে। ভাষা ভিন্ন হলেও সেই আবেগের সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দর্শক। সুর ও গল্পের মাধ্যমে মানুষের এই কাছাকাছি আসার বিষয়টিই বিশ্ব অপেরা দিবসের মাধ্যমে সামনে আনতে চাওয়া হয়। আয়োজকদের মতে, অন্যের অনুভূতি বুঝতে এবং ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি উদার হতে এই শিল্প বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে উদ্‌যাপনের পাশাপাশি এই শিল্পের নেপথ্যে থাকা মানুষদের অনিশ্চয়তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। জার্মান অর্কেস্ট্রা পরিচালক কেভিন জন এডু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় জানিয়েছেন, “বিশ্বজুড়ে বহু অপেরাশিল্পী ও কলাকুশলী এখনো স্বল্পমেয়াদি চুক্তি, মহড়ায় পারিশ্রমিক না পাওয়া ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করেন।” অপেরাকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে তাঁদের ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সব মিলিয়ে রোববার সিডনি অপেরা হাউসে কেটেছে এক ব্যস্ত ও উৎসবমুখর দিন। নানা আয়োজনে মুখর এই প্রাঙ্গণে জড়ো হয়েছিলেন বিভিন্ন দেশ ও বর্ণের মানুষ। ভাষা আর সংস্কৃতির সব বাধা পেরিয়ে তাঁরা একসঙ্গে উপভোগ করেছেন সুর ও অভিনয়ের রস। কেউ ক্যামেরাবন্দি করেছেন প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত, আর কেউ ফিরেছেন মঞ্চের মুগ্ধতা বুকে নিয়ে।