আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী ৮৭ বছর বয়সে কলকাতায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। স্বতন্ত্র রেখাচিত্র, মানবদেহের নিখুঁত অভিব্যক্তি এবং সমাজবাস্তবতার অসাধারণ চিত্রায়ণের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের মরণপণ লড়াইয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে তিনি ছবি এঁকেছিলেন, যা ছিল বাংলাদেশের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
মুক্তকণ্ঠের সম্পাদক মতিউর রহমানের সঙ্গে যোগেন চৌধুরীর দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও হৃদ্যতা ছিল। ২০১৪ সালে প্রকাশিত মতিউর রহমানের বই ‘আকাশভরা সূর্যতারা: কবিতা–গান–শিল্পের ঝরনাধারায়’-তে যোগেন চৌধুরীকে নিয়ে ‘যোগেন চৌধুরী: মানবমুক্তিতে বিশ্বাসী’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। শিল্পীর প্রয়াণে সেই স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি পুনরায় অনলাইন পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
স্মৃতিচারণ করে বলা হয়, ১৯৮৭ সালের আগস্টের এক সন্ধ্যায় শান্তিনিকেতনে প্রথমবার যোগেন চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর ১৯৮৮ সালের জুন মাসে পুনরায় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। প্রথম সাক্ষাতের সময় ভারতের আরেক প্রথিতযশা শিল্পী গণেশ পাইনের একটি পরিচয়পত্র সঙ্গে ছিল, যা সেই প্রথম পরিচয়েই এক অনন্য আন্তরিকতার পরিবেশ তৈরি করেছিল। শিল্পী যোগেন চৌধুরীর জন্মভূমি বাংলাদেশে, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়।
শান্তিনিকেতনের কলাভবনে প্রথম সাক্ষাতের পর যোগেন চৌধুরী আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, ‘সন্ধ্যায় বাসায় আসেন, গল্প করব।’ সেই সন্ধ্যায় গভীর রাত পর্যন্ত দুই দেশের কথা, তাঁর শিল্পীজীবনের অতীত-বর্তমান এবং গানের আসরে জমেছিল আড্ডা। সেই প্রথমবার ইফফাত আরার রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেট শুনে তিনি আবেগবিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন।
কথোপকথনের গভীরে উঠে এসেছিল তাঁর জীবনসংগ্রাম ও শৈশবের স্মৃতি। নিজের শিকড়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৩৯ সালে আমার জন্ম। বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার ডহরপাড়া গ্রামে। ৯ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম। পড়াশোনা শুরু ওই গ্রামের পাঠশালাতেই। ১৯৪৮ সালে কলকাতায় চলে আসি। আমার বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন আরও কিছুদিন। চৌধুরী বংশের জমিদারি ছিল। আড়াই হাজার বিঘা জমি ছিল আমাদের। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে আমার বাবাও চলে আসেন কলকাতায়।
‘আমাদের সেই ডহরপাড়া গ্রামের ছোটবেলার সবকিছু মনে পড়ে এখনো। সেসব কথা এখনো স্মৃতিতে আসা-যাওয়া করে। সবকিছু দেখতে পাই, হুবহু মনে পড়ে। কোথায় রান্নাঘর ছিল তার পেছনে পুকুর ছিল। সেই গ্রামে বড় আয়োজনে দুর্গাপূজা হতো। যাত্রা দেখতে যেতাম। স্কুল পালিয়ে মাছ ধরতাম। সেসব স্মৃতি এখনো বড় বেশি পিছু টানে। আমাদের গ্রামে থিয়েটার হতো। বাবা মেয়েদের পাট করতেন। ‘কর্ণকুন্তী’ নাটকে কুন্তীর অভিনয় করতেন। সে নাটক আমি দেখেছি। নাটকের মঞ্চের সামনের পর্দার দৃশ্য আমার বাবা তৈরি করেছিলেন। মনে আছে, অনেকগুলো সাপের সামনে কৃষ্ণ বাঁশি বাজাচ্ছে। বাবার আঁকা আর অভিনয়ের খুব শখ ছিল। খুব উত্সাহ নিয়ে দুর্গা বানাতেন। থিয়েটারের জন্য বানাতেন মুকুট আর সাজানোর অন্য জিনিসপত্র। এসব ব্যাপারে বাবা খুব দক্ষ ছিলেন। তিনি ৯১ বছর বয়সে মারা যান। আমার মা, ইন্দুমতী চৌধুরী সুন্দর আলপনা করতেন। রঙিন সুতায় কাঁথা করতেন।
‘আমাদের বাড়ি ছিল কাঠের দোতলা। একা একা দোতলায় যেতাম। সেখানে থিয়েটারের জিনিসপত্তর জমা থাকত। মুকুট, তলোয়ার ইত্যাদি ঘাঁটাঘাঁটি করতাম। রং থাকত। সে রং নিয়ে কাজ করতাম। চুন আর রাংচিতা দিয়ে হলুদ রং হতো। কাঠকয়লা দিয়ে কালো রং করতাম আর চুন দিয়ে সাদা। এগুলো দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা আর সরস্বতীর প্রতিমা বানাতাম।
‘আরও অনেক স্মৃতি। কুমোর যখন দুর্গা বানাতে আসত, আমরা বসে বসে দেখতাম। খড়, তুষ ইত্যাদি দিয়ে কীভাবে মুখ, হাত, আঙুল হয়ে যেত দেখতাম। কীভাবে রং দিয়ে শেষ হতো দেখতাম। ওরা চলে গেলে নানা কিছুর টুকরা পড়ে থাকত। যাত্রার পর পুঁতি, চুমকি পড়ে থাকত, সেগুলো তুলে আনতাম। তা দিয়ে নানা কিছু বানানোর চেষ্টা করতাম।
‘বর্ষার স্মৃতি—বৃষ্টি হচ্ছে, জলে ভরে গেল চারদিক, মাছ সামনে চলে এল, এ রকম অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। বড়শি দিয়ে মাছ ধরতাম খাল-বিলে। টাকি মাছ পেতাম। কই মাছ উঠে আসত। বর্ষায় নৌকায় করে দূরে চলে যেতাম। সরু নৌকা দিয়ে যেতাম। নিজেদের নৌকা ছিল। ধান ও পাটখেতের মধ্য দিয়ে যেতাম। খেতের পরিষ্কার জলের মধ্যে পুঁটি-খলশে মাছ দেখতাম। সে মাছগুলোর লাল-সবুজ রং এখনো চোখে ভাসে। খাল-বিলে শাপলা ফুল হতো। সেগুলো দেখতাম। শাপলা-শালুক ভেঙে শাঁস খেতাম।
‘আমার প্রথম দিকের ছবিতে, বিশেষ করে একটা সময়ে লতা-পাতা, মাছ-গাছ—এসব কিছু এসেছে আমার ছোটবেলা থেকে। এগুলো এখনো খুব বেশি হন্ট করে। ডহরপাড়া গ্রামের সেসব স্মৃতি আমাকে অতীতের সেই দিনগুলোতে নিয়ে যায়। আবার সত্তরের দশকে সে স্মৃতিগুলো এসেছে আমার কাজে। যখন ধীরস্থির হয়ে কাজ শুরু করি, তখন সে স্মৃতিগুলো ফিরে ফিরে আসে।
‘১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পর যখন কলকাতায় চলে আসি, তখন তো প্রচণ্ড শরণার্থীসমস্যা, খাদ্যাভাব, খাদ্য আন্দোলন আর ধর্মঘট চলেছে। এসব নিয়ে প্রচুর স্কেচ করেছিলাম। সে জন্য জানেন, আমার ছবিতে শুরু থেকে একটা দুঃখ-বেদনার ব্যাপার আছে। পরেও যা কিছু এঁকেছি, তাতে একটা কালো ও অন্ধকারের দিক রয়েছে।
‘বাবা-মার কাছ থেকে ছবি আঁকার ব্যাপারটা পেয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকেই ছবি ভালো লাগত। কলকাতাতেই ছবির জগৎ, চিত্রকলা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা হতে শুরু করে। সে সময়ই অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম শুনি। তাঁর বিখ্যাত ছবি “মৃত্যুশয্যায় শাহজাহান” পাশে বসে আছেন জাহানারা, এটার কপি সংগ্রহ করি। একই সময়ে পিকাসোর “শান্তি কপোত”-এর কপিও সংগ্রহ করি। স্কুল পাস করেই আর্ট কলেজে ভর্তি হই। সেখান থেকে পাস করে হাওড়া স্কুলে চাকরি নিই। তারপর হ্যান্ডলুম বোর্ডে চাকরি করি।’
এরপর চার বছরের জন্য প্যারিসে যান যোগেন চৌধুরী। ইউরোপীয় শিল্পের প্রভাব এবং নানা জিজ্ঞাসার কারণে প্যারিস থেকে ফেরার পর প্রায় দেড় বছর তিনি ছবি আঁকতে পারেননি। শিল্পীর দায় ও কাজের উদ্দেশ্য নিয়ে দীর্ঘ চিন্তার পর তাঁর কাজে আধুনিকতার প্রতিফলন ঘটে। তিনি জানান, ‘ছবির জন্য সেসব চিন্তাভাবনা খুব সাহায্য করেছিল। এভাবে না এগোলে ফল ভালো হতো না। প্যারিস থেকে ফিরে আমার ছবিতে আধুনিকতার প্রতিফলন ঘটে। তবে প্রথমে ছবিতে সেই শৈশবের লতা, পাতা, ফুল চলে আসে। বিয়ের পর ছবিতে রোমান্টিকতা আসতে শুরু করল। তখনই বিবাহিত জীবন নিয়ে কিছু কৌতুক তৈরি করি ছবিতে। তারপর আস্তে আস্তে ব্যক্তিজীবন থেকে বের হয়ে অন্য মানুষ, অন্য বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করি।’
মানবিকতায় বিশ্বাসী এই শিল্পী মনে করতেন, কেবল ছবি আঁকলেই হবে না, মানুষের জন্য কিছু করা প্রয়োজন। জীবনের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে প্রকৃত শিল্প সৃষ্টি সম্ভব নয়। পরবর্তীতে দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাজনীতির ভেতরের কদর্য রূপ প্রত্যক্ষ করেন এবং মেরুদণ্ডহীন রাজনীতিকদের নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ছবি আঁকেন, যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তবে আরাম-আয়েশের চেয়ে কাজকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি শান্তিনিকেতনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর মতে, ‘দিল্লিতে আরাম-আয়েশে থাকার বহু সুযোগ ছিল কিন্তু সেখানে থাকলে কাজ হতো না। কাজ করার জন্য, ছবি করার জন্যই আমি শান্তিনিকেতনে এসেছি স্থায়ীভাবে বসবাস করতে।’
মাধ্যম নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মুক্ত। তাঁর ভাষায়, ‘যা আসবে, যা করতে চাই, সেটাই করব। জলরং, প্যাস্টাল, তেলরং বা শুধু কালি—এসব মাধ্যমেই কাজ করি। আমার কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই।’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাঁর টান ছিল অপরিসীম। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জীবনে কারও সরাসরি প্রভাব নেই। তবে ভারতের শিল্প আন্দোলন বা ইউরোপীয় শিল্প আন্দোলনের প্রভাব রয়েছে। শিল্পী-জীবনের প্রথমে অপ্রত্যক্ষভাবে পিকাসোর কিছু প্রভাব পড়েছে আমার কাজে। পিকাসোর কাজ সব সময়ই খুব ভালো লাগে।’
পূর্বসূরিদের সম্পর্কে তাঁর শ্রদ্ধা ছিল গভীর। তিনি বলেন, ‘নন্দলাল বসুকে শিক্ষক হিসেবে মানি, তাঁর কাজও ভালো লাগে। যামিনী রায়ের কিছু ছবি পছন্দ করি, কিছু করি না। মকবুল ফিদা হুসেন অত্যন্ত শক্তিশালী শিল্পী। কিছু কাজে পৌনঃপুনিকতা রয়েছে। এখনো পরিতোষ সেনের কাজ পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। সোমনাথ হোর আরেক শিল্পী, যাঁকে শ্রদ্ধা করি। কে জি সুব্রামানিয়ানের কাজ পছন্দ করি। আর গণেশ পাইনের কাজ বেশ ভালো লাগে।’
মানবমুক্তির কথা বলে তিনি জানান, ‘আমি মানবমুক্তিতে বিশ্বাস করি। যারা মানুষের মুক্তির কথা বলে, তাদের পথ ভিন্ন। আমিও চাই দুর্দশা, দুর্গতি, অন্যায় থেকে মানুষের মুক্তি হোক। তবে আমার মাধ্যম আর তাদের পথ ভিন্ন। সেখানে হয়তো আমাদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। আমি আমার স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ন রাখতে চাই। “জীবনের জন্য শিল্প” এই মন্ত্রে আমি বিশ্বাস করি। শিল্পকে বাদ দিয়ে জীবন হতে পারে না।’
১৯৯২ সালের জুন মাসে তিনি ঢাকায় আসেন ২০ জন শিল্পীর প্রদর্শনীর কমিশনার হিসেবে। সেই সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা শিক্ষায়তন, জাতীয় জাদুঘর, বিসিক ডিজাইন সেন্টার এবং সোনারগাঁর লোকশিল্প জাদুঘর পরিদর্শন করেন। ঢাকার শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর মতবিনিময় হয় এবং তিনি মনে করেন ভাষার মিলের কারণে এখানকার মানুষের সঙ্গে তাঁর দ্রুত হৃদ্যতা তৈরি হয়েছে।
ওয়ারীর লারমিনি স্ট্রিটের এক দুপুরে সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, কাইয়ুম চৌধুরী, নিতুন কুন্ডু ও রফিকুন্নবীর সঙ্গে তাঁর আড্ডা জমেছিল। বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলন সম্পর্কে তাঁর অভিমত ছিল, ‘উত্সাহী শিল্পী আছেন প্রচুর। স্বাধীনতার পর নতুন পরিবেশে কাজ করছেন সবাই। বলা যায়, শিল্পকলা আন্দোলনে এই অঞ্চলে ভারতের পরই বাংলাদেশের স্থান। এখানকার সাংস্কৃতিক জীবনে প্রাণের পরশ পাওয়া যায়।’
ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জয়নুল আবেদিনের সোনারগাঁর প্রদর্শনী অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ডিজাইন সেন্টারে খুব ভালো কাজ হচ্ছে—কলকাতার চেয়ে ভালো। আর্ট কলেজের পরিবেশ খুব ভালো লেগেছে। অনেকটা শান্তিনিকেতনের পরিবেশের মতো মনে হলো। জাতীয় জাদুঘর ভালো তৈরি হয়েছে—পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ব্যবস্থাপনা। প্রচুর দর্শক আসে।’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে আঁকা তাঁর সেই বিশেষ ছবিটির কথা তিনি বারবার উল্লেখ করতেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল ঢাকার কোনো জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে সেই ছবি উপহার দেওয়া। সেই সময়ে তিনি কিছু কবিতাও লিখেছিলেন। মানবকল্যাণের ভাবনা এবং শিল্পের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়ে যোগেন চৌধুরী হয়ে ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।