ভারতের শিল্পকলার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী আর নেই। আজ রোববার সকালে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর প্রয়াণ ঘটে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৮৭ বছর।
ভারতীয় চিত্রশিল্পের ইতিহাসে যোগেন চৌধুরী এক অনন্য মাইলফলক স্থাপন করেছিলেন। তাঁর তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠত রাজনীতি এবং সমাজের নানা অসংগতি ও বৈপরীত্য; তিনি মূলত ব্যঙ্গাত্মক ছবির মাধ্যমেই এসব ফুটিয়ে তুলতেন। তাঁর শিল্পকর্মে ভারতীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি ইউরোপীয় শিল্প আন্দোলনের গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে একাধিক দুর্গাপূজার থিমের নকশা করার ক্ষেত্রেও তাঁর সৃজনশীলতা প্রকাশ পেয়েছে।
শিল্পচর্চার পাশাপাশি রাজনীতির সাথেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হন যোগেন চৌধুরী এবং ২০২০ সাল পর্যন্ত সেই মর্যাদাপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অসাধারণ শিল্পপ্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ দেশ ও বিদেশের অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন এই শিল্পী।
১৯৩৯ সালে বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার দহরপাড়া গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন যোগেন চৌধুরী। তাঁর পিতা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন ফরিদপুরের একজন জমিদার। শৈশবে মায়ের আলপনা দেওয়ার দক্ষতা দেখে ছবি আঁকার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়।
আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশভাগের সেই উত্তাল সময়ে তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে আসে। সেখানেই শুরু হয় তাঁর শিল্পশিক্ষার হাতেখড়ি। তিনি কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফটে পড়াশোনা করেন। শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি হাওড়া জেলা স্কুলে অঙ্কন শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে কলকাতার হ্যান্ডলুম বোর্ডে ডিজাইনার হিসেবে যোগ দেন তিনি। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯৬৫ সালে তিনি প্যারিসে পাড়ি জমান। এছাড়া রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারিতে কিউরেটরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি।
দেশভাগের করুণ বাস্তবতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন যোগেন চৌধুরী, যা তাঁকে উদ্বাস্তু করে ফেলেছিল। সেই উদ্বাস্তু জীবনের গভীর ক্ষত ও বেদনা তাঁর শিল্পের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কলকাতার আর্ট কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে প্যারিসে পড়াশোনা করে ফেরার পর তিনি শান্তিনিকেতন কলাভবনের অধ্যাপক এবং প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ মাস ধরে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন যোগেন চৌধুরী। শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে গত ১৬ অক্টোবর তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।