২০২৪ সালের ৫ জুলাই এক দুঃসংবাদ আসে বুশরা মাহজাবীনের জীবনে; ধরা পড়ে তার শরীরে ব্লাড ক্যানসার। নবম ও দশম শ্রেণির অর্ধেকের বেশি সময় তাকে কাটাতে হয়েছে হাসপাতালের বিছানায়। টানা সাত মাস জীবন ও মৃত্যুর এক কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে চিকিৎসকরা তাকে হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে বুশরা চেয়েছিলেন অন্য সব সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো হলে বসে পরীক্ষা দিতে। অদম্য আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রমের জোরে শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য অর্জন করেন তিনি।
ঝালকাঠি সরকারি হরচন্দ্র বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৯০ শতাংশের বেশি নম্বরসহ জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন বুশরা। তবে তার লড়াই এখনো শেষ হয়নি, চিকিৎসা এখনো চলছে। প্রতি মাসে একবার এবং প্রতি তিন মাসে একবার বিশেষ কেমোথেরাপি নিতে হয় তাকে। এই চিকিৎসার তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মাসের শেষ দিকে শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে, অনেক সময় মাথা সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকাই তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
নিজের এই অনন্য সাফল্য উদ্যাপন করতে আজ রোববার ঝালকাঠিতে আয়োজিত 'শিখো–মুক্তকণ্ঠ জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা' অনুষ্ঠানে অংশ নেন বুশরা। দিনটি ছিল তার জন্য অত্যন্ত বিশেষ। সকাল হতেই মাকে সাথে নিয়ে তিনি পৌঁছে যান ঝালকাঠি সরকারি কলেজের নতুন ভবনের হলরুমে।
বুশরার মা মেহেরুন্নেছা আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, ‘মুক্তকণ্ঠের জিপিএ–৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে আমার মেয়ের শারীরিক কষ্ট দূর হয়ে গেছে। মেয়েটি অনুষ্ঠানে এসে বন্ধুদের সঙ্গে হইহুল্লোড় ও সেলফি তোলায় ব্যস্ত। মেয়ে কয়েক দিন ধরে এই অনুষ্ঠান নিয়ে খুব উচ্ছ্বসিত ছিল।’
‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় মুক্তকণ্ঠের আয়োজনে এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর পৃষ্ঠপোষকতায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ঝালকাঠি পর্বের আয়োজন করা হয়।
পুরো আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। এছাড়া সহযোগিতায় ছিল কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভা।
মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগেই কৃতী শিক্ষার্থীদের হাতে ক্রেস্ট ও উপহার সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে ঝালকাঠি সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ। কেউ এসেছেন বাবা-মায়ের হাত ধরে, আবার কেউ এসেছেন বন্ধুদের সাথে। দীর্ঘ সময় পর পুরোনো সহপাঠীদের সাথে দেখা হয়ে কেউ আলিঙ্গন করছেন, আবার কেউ স্মৃতি ধরে রাখতে বন্ধুদের সাথে সেলফি তুলছেন।
এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কাঁঠালিয়া উপজেলার আমুয়া থেকে এসেছেন রাহায়ে রুহানি। তিনি জানান, ‘মুক্তকণ্ঠের জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আসার জন্য গত তিন দিন কোথাও বেড়াতে যাইনি। প্রথমবারের মতো এমন কোনো অনুষ্ঠানে এলাম। অন্য বন্ধুরাও এসেছে। খুবই ভালো লাগছে।’
সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। ঝালকাঠি বন্ধুসভার সভাপতি শাকিল হাওলাদারের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন মুক্তকণ্ঠের ঝালকাঠি প্রতিনিধি আ স ম মাহমুদুর রহমান। তিনি অন্যান্য অতিথিদের মঞ্চে আমন্ত্রণ জানান। অতিথিরা শিক্ষার্থীদের সামনে স্বপ্ন দেখার সাহস, অধ্যবসায় এবং মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।
ঝালকাঠি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়তে আমাদের যে প্রজন্ম গড়ে তোলা দরকার, মুক্তকণ্ঠ নিজেদের অবস্থান থেকে সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।’ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, ‘তোমাদের নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। নিজের শক্তির ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখতে হবে। মানুষের কল্যাণে ও সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে নিজেদের কাজে লাগাতে হবে।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ, ঝালকাঠি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পবিত্র কুমার দাস, ঝালকাঠি সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ইলিয়াস ব্যাপারী, মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভার উপদেষ্টা শিক্ষক হামিদা খানম, জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান এবং ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সভাপতি আক্কাস সিকদার। অনুষ্ঠানের শেষে মুক্তকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি আ স ম মাহমুদুর রহমান শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলার শপথ পাঠ করান।
অধ্যক্ষ ইলিয়াস ব্যাপারী তার বক্তব্যে বলেন, পরীক্ষায় ভালো ফল করা মানেই চূড়ান্ত সফলতা নয়। ভালো ফলের পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠা, নির্মোহ মানুষ হয়ে ওঠা, নিবেদিত, মানবিক ও দেশপ্রেমে সমৃদ্ধ মানুষ হয়ে ওঠা অনেক বেশি জরুরি।
আলোচনা, কুইজ এবং পুরস্কার বিতরণীর পাশাপাশি সংগীত, নৃত্য, শিক্ষার্থীদের গল্প ও আবৃত্তির মাধ্যমে সারা দিনের আয়োজনটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।