বাংলার মাটি, প্রকৃতি এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রামকে তুলির আঁচড়ে অনন্য রূপ দেওয়া বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ শনিবার (১০ অক্টোবর)। তার শিল্পকর্মে বারবার ফুটে উঠেছে কৃষকের অদম্য শক্তি এবং গ্রামীণ জীবনের প্রকৃত রূপ।
এই বিশেষ দিনটি স্মরণ করতে নড়াইল জেলা প্রশাসন এবং এসএম সুলতান কমপ্লেক্সের যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই প্রথিতযশা শিল্পী। পরবর্তীতে নড়াইল শহরের কুড়িগ্রাম-মাছিমদিয়া এলাকায় অবস্থিত তার নিজ বাড়ির আঙিনায় তাকে সমাহিত করা হয়।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচির বিস্তারিত সূচিতে দেখা যায়, সকাল ৬টায় শিল্পীর আত্মার মাগফিরাত কামনায় পবিত্র কোরআন খতম অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৯টায় তার সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ এবং সকাল সাড়ে ৯টায় দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া সকাল ১০টায় একটি আলোচনা সভা এবং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া চিত্রা নদীর তীরের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এসএম সুলতান। তার বাবা মো. মেছের আলী ও মা মোছা. মাজু বিবি তাকে আদর করে ‘লাল মিয়া’ বলে ডাকতেন।
মাটি ও মানুষের শিল্পী হিসেবে পরিচিত সুলতানের চিত্রকর্মে গ্রামীণ জীবনের নানা অনুষঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে। কৃষকের কঠোর শ্রম, ফসল উৎপাদন, নদী, খাল, প্রকৃতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা তার ছবিতে এক ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। তার উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘পাট কাটা’, ‘ধান কাটা’, ‘ধান ঝাড়া’, ‘গ্রামের খাল’, ‘গ্রামের দুপুর’, ‘নদী পারাপার’, ‘ধান মাড়াই’, ‘মাছ ধরা’, ‘নদীর ঘাটে’, ‘গুন টানা’, ‘শাপলা তোলা’ ও ‘শরতের গ্রামীণ জীবন’।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার প্রতিভার স্বাক্ষর ছিল অনন্য। ১৯৫০ সালে ইউরোপের একটি যৌথ চিত্র প্রদর্শনীতে এসএম সুলতানের আঁকা ছবি পাবলো পিকাসো ও সালভাদর দালির মতো বিশ্ববিখ্যাত শিল্পীদের কাজের পাশাপাশি প্রদর্শিত হয়। ১৯৭৬ সালে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে তার একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে দেশের শিল্পানুরাগী ও সুশীল সমাজের কাছে তিনি নতুনভাবে পরিচিতি পান।
শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্ট আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন।
শিশুদের প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে আসা এবং তাদের মধ্যে শিল্পচর্চার আগ্রহ তৈরি করার স্বপ্ন দেখতেন এসএম সুলতান। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি নিজের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করে নড়াইল শহরের মাছিমদিয়া এলাকায় চিত্রা নদীর তীরে ‘শিশুস্বর্গ’ নামে একটি ভাসমান নৌকা তৈরি করেন। নৌকায় করে শিশুদের প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচয় করানো এবং তাদের ছবি আঁকায় উৎসাহিত করাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য।
১৯৯৪ সালে তার প্রয়াণের পর তার স্মৃতি সংরক্ষণ এবং শিল্পকর্মের ঐতিহ্য ধরে রাখার লক্ষ্যে সরকারি অর্থায়নে তার বাড়িতে নির্মাণ করা হয় এসএম সুলতান কমপ্লেক্স। তার অসাধারণ শিল্পকর্ম, জীবনদর্শন এবং সৃষ্টিশীলতা আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে অনুপ্রেরণার এক বিশাল উৎস হয়ে আছে।