দুই আঞ্চলিক সংগঠনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ফলে রাঙামাটির সীমান্তঘেঁষা জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সাজেকে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় একদিকে যেমন স্থবির হয়ে পড়েছে পুরো পর্যটন খাত, অন্যদিকে সাজেক ইউনিয়নের বেশ কিছু দুর্গম গ্রামে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে তীব্র ওষুধের সংকট।

পাঁচ দফা দাবিতে সাজেক সড়কে আজ চতুর্থ দিনের মতো অবরোধ কর্মসূচি পালিত হওয়ায় পুরো এলাকাটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিত সাজেকে প্রায় ৩১ হাজার ৩৯৫ জন মানুষ বসবাস করেন। টানা অবরোধ এবং যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকার কারণে বিশেষ করে ২ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষের জীবন এখন চরম সংকটে।

সাজেক পর্যটন কেন্দ্রের মুদি দোকান 'তারিং টেলিকম অ্যান্ড ডিপার্টমেন্টাল স্টোর'-এর মালিক জনসিম চাকমা বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করে বলেন, “এখানে প্রধানত ৩টি মুদির দোকান রয়েছে। আমার দোকানে ইতোমধ্যে চাল ও চিনি শেষ হয়ে গেছে। পাশের অন্যান্য দোকানে ডাল, সয়াবিন তেল, চিনি এমনকি ডিজেল ও অকটেনও শেষ। যেটুকু মজুত আছে, তা দিয়ে আর মাত্র দুই-একদিন চলা সম্ভব।”

তিনি আরও জানান, “গত ২১ অক্টোবর শেষবারের মতো পণ্যবাহী গাড়ি এসেছিল। পরিস্থিতি যে এত জটিল হবে, তা কেউ ধারণা করতে পারেনি।”

স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী পারভেজ খান বাপ্পী জানান, পর্যটকদের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও সাজেকের বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজে অনেক কর্মচারী কর্মরত আছেন। গত চার দিন ধরে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় কোনো মালামাল ভেতরে ঢুকছে না। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রিসোর্ট ও কটেজের কর্মচারীরাও চরম খাদ্যসংকটে পড়েছেন।

সাজেক ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধি অনিত্য ত্রিপুরা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমার ওয়ার্ডে প্রায় দেড় হাজার পরিবার বসবাস করে। শুধু সাজেক পর্যটন কেন্দ্রেই রয়েছে ৫০০টির বেশি পরিবার। পণ্যবাহী গাড়ি না আসায় স্থানীয়দের মাঝে খাদ্য সংকট চরম আকার ধারণ করছে। শুধু খাদ্য সংকট নয়, ফার্মেসিগুলোতে কিছু ওষুধ থাকলেও জরুরি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর তীব্র ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় কোনো রোগী বা দুর্ঘটনাকবলিত মানুষকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো কোনো যানবাহন কিংবা যাতায়াতব্যবস্থা চালু নেই। এতে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে।”

সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, সাজেক বর্তমানে প্রায় পর্যটকশূন্য। পর্যটকদের অনুপস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়েছেন। সাজেককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ১৩৫টি কটেজ-রিসোর্ট, প্রায় ৫০টি রেস্টুরেন্ট এবং শতাধিক ভ্রাম্যমাণ দোকান এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অথচ কটেজগুলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন প্রদান করতে হচ্ছে, যা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতি সম্পর্কে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজানা মুক্তকণ্ঠকে জানান, খাদ্য সংকটের বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান কিংবা হেডম্যান-কারবারিরা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাননি। তারা জানালে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উল্লেখ্য, পাঁচ দফা দাবিতে চতুর্থ দিনের মতো অবরোধ অব্যাহত থাকায় সাজেক সড়কটি সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে আছে।