রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটন কেন্দ্র সাজেকে দুই সংগঠনের ডাকে পালিত অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। আজ রোববার সকাল থেকেই সাজেক সড়কে কোনো যানবাহনের চলাচল লক্ষ্য করা যায়নি। পর্যটকদের অনুপস্থিতিতে সাজেকের জনপ্রিয় রুইলুই পর্যটন কেন্দ্র এখন সম্পূর্ণ সুনসান।

পর্যটন কেন্দ্রের বাইরের বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি এখনো থমথমে হয়ে আছে। অবরোধের সমর্থনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পিকেটিং কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। উদ্ভূত এই সংকট নিরসনে এবং সমস্যা সমাধানে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।

সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সাজেকে এখন কোনো পর্যটক অবস্থান করছে না। তাই সব হোটেল-রিসোর্টের কর্মীরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। রেস্তোরাঁগুলোতেও ক্রেতা নেই।”

সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ ডাকে এই অবরোধ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এটি এই দুই সংগঠনের ডাকা তৃতীয় দফার কর্মসূচি। তৃতীয় দফার এই অবরোধ আজ চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে।

অবরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সাজেকের ১০ নম্বর, ১৪ কিলো ও হাজাছড়া এলাকায় পিকেটিং চলছে। সাজেক সড়কে কোনো যানবাহন চলাচল করছে না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি চলবে।”

সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানান, অবরোধ চলাকালীন এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে এবং পুরো এলাকায় বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

টানা অবরোধের এই পরিস্থিতিতে আলোচনার লক্ষ্যে আজ রোববার সকালে জেলার হেডম্যান ও কার্বারিদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভা আয়োজন করে জেলা প্রশাসন। সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান।

সভায় সাজেকের বিদ্যমান সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সদস্যরা হলেন লংগদু কার্বারি হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা কল্যাণমিত্র চাকমা, সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহসভাপতি ভবতোষ দেওয়ান এবং সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা।

কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করে শান্তি বিজয় চাকমা বলেন, “প্রশাসন ও দুই এমপি মিলে কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। প্রশাসনসহ সাজেকের হেডম্যান-কার্বারিদের নিয়ে আলোচনা করা হবে। তবে কবে সভা হবে, তা এখনো জানানো হয়নি। সময় হলে আমাদের জানিয়ে দেওয়া হবে বলে মিটিংয়ে বলা হয়েছে।”

মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, “সাজেকের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি ও সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলোচনার আয়োজন করবেন। এ কাজে থানার ওসি ও প্রশাসন সহযোগিতা করবে। যাঁরা নিজেদের কার্বারি দাবি করছেন, তাঁদের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে।”

ওয়াদুদ ভূঁইয়া আরও বলেন, “সাজেকে কিছু গোষ্ঠী সমস্যা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। নানা পক্ষের মানুষ হতে পারে, নির্দিষ্ট কোনো গ্রুপের হতে পারে। তবে এর জন্য আমি স্থানীয়দের দায়ী করছি না।”

উল্লেখ্য যে, সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন তাদের তিন দফা দাবিতে গত ১১ অক্টোবর সাজেকে এক দিনের অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছিল। এরপর ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় পুনরায় অবরোধের ডাক দেওয়া হয়। তবে শারদীয় দুর্গাপূজার কারণে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে গত বুধবার দুটি সংগঠন এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ঘোষণা করে।

নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটন কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। এই নির্দেশনা অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পর্যটকেরা সাজেক ছাড়তে শুরু করেন। তবে ফেরার পথে উজো বাজার এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ইউপিডিএফ-এর সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালিয়েছেন, যদিও ইউপিডিএফ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এদিকে সাজেকে অবরোধ চলাকালীন হামলা, লাঠিপেটা এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন গতকাল শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অর্ধদিবস অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে।