হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে কওমি ঘরানার সাতটি দল নিয়ে গঠিত ‘সমমনা ইসলামি দলে’ স্থান পায়নি বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। কওমি ধারার এই দলটি বর্তমানে রাজনীতিতে সক্রিয় এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নেতাদের দাবি, হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পেছনে তাদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ইসলামপন্থিদের বৃহত্তর ঐক্যের যে ডাক এই প্ল্যাটফর্ম থেকে দেওয়া হয়েছে, তারা তাকে স্বাগত জানান। তবে তারা মনে করেন, এই ঐক্য প্রক্রিয়ার শুরুতেই খোদ কওমি ঘরানার দলগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি করা অত্যন্ত দুঃখজনক।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নিবন্ধন না থাকার বিষয়টি সামনে আনছেন হেফাজতের নেতারা। তাদের মতে, ‘সমমনা ইসলামি দলে’ আপাতত শুধুমাত্র নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে অনিবন্ধিত দলগুলোকেও এই জোটে নেওয়া হতে পারে বলে তারা জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য যে, প্রখ্যাত আলেম মরহুম মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী (হাফেজ্জী হুজুর) বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে দলটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। তৎকালীন মহাসচিব মাওলানা জাফরউল্লাহ খানের নেতৃত্বে এক অংশ আলাদা হয়, যার মহাসচিব ছিলেন হাফেজ্জী হুজুরের নাতি মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ আশরাফ।
দলের অন্য অংশের আমির ছিলেন হাফেজ্জী হুজুরের ছেলে আতাউল্লাহ হাফেজ্জী এবং মহাসচিব ছিলেন মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজি। বর্তমানে এই অংশের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজি এবং মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ হক্কানি। এই অংশটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধিত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলটি ১১ দলীয় জোটে থাকলেও নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে তারা জামায়াত জোট ছেড়ে এককভাবে ভোটে অংশ নেয়।
জামায়াত জোট ত্যাগ করা অংশের বিপরীতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের অন্য অংশটি এই ১১ দলীয় জোটে যোগ দেয়। হেফাজতের জোটে ডাক না পাওয়া এই অংশের আমির মাওলানা আবু জাফর কাসেমী এবং মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম।
দলের নেতারা জানান, নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হলেও বর্তমানে হাইকোর্টে এ নিয়ে মামলা চলছে। তবে উভয় পক্ষই দলের মূল নির্বাচনি প্রতীক ‘বটগাছ’ দাবি করে আসছে।
১১ দলীয় জোটে থাকা খেলাফত আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, তারা মাত্র দুই মাস আগে জামায়াতের জোটে যোগ দিয়েছেন এবং বর্তমানে জোটের প্রতিটি সভা-সমাবেশে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। শুধুমাত্র নিবন্ধনের অভাবকে অজুহাত বানিয়ে তাদের হেফাজতের জোট প্রক্রিয়ায় না ডাকা দুঃখজনক বলে তারা মনে করেন। তাদের দাবি, রাজনীতিতে এর চেয়ে কম সক্রিয় দলগুলোকেও হেফাজতের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের অংশের তৎকালীন আমির জাফরউল্লাহ খানের মাধ্যমে দলের নিবন্ধন করা হয়। পরে ওই অংশের আমির আতাউল্লাহ হাফেজ্জী জোরজবরদস্তি করে তাদের নামে নিবন্ধন নিয়ে নেন। খেলাফত আন্দোলনের পুরোনো এবং পরীক্ষিত কর্মীরা আমাদের সঙ্গে আছেন।’
হেফাজতের এই জোট গঠনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মুফতি ফখরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সমমনা ইসলামি দল সরকারদলীয় চক্রান্তের অংশ। ১১ দল ভাঙতে এ জোট করা হয়েছে। এটি হেফাজতকে সরকারদলীয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত করার নতুন ষড়যন্ত্র।’
তার মতে, দুটি প্রধান কারণে ‘সমমনা ইসলামি দল’ দীর্ঘস্থায়ী হবে না। প্রথমত, এটি ১১ দল ভেঙে সরকারদলীয় ‘বি টিমে’ পরিণত হওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই জোটে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রয়েছে, যারা কখনোই কোনো ঐক্য দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয়নি। তিনি দাবি করেন, এরা আগে একসঙ্গে ছিল না এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না।
উল্লেখ্য, মুফতি ফখরুল ইসলাম ২০১৩ সালে হেফাজতের ঢাকা মহানগরের প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও বর্তমানে হেফাজতে ইসলামের কোনো পদে নেই তিনি।
কওমি ঘরানার সাতটি দলকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৬ জুলাই সংশ্লিষ্ট দলের নেতাদের নিয়ে একটি বৈঠক করেন হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। বেশ কয়েকটি বৈঠকের পর গত ২২ অক্টোবর ‘সমমনা ইসলামি দল’-এর ব্যানারে কাজ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সাতটি দল।
হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশীরুল্লাহ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘হেফাজত শুধু নিবন্ধিত দলগুলোকে নিয়ে কাজ করেছে। তাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে সমমনা ইসলামি দল। জোটের সদস্যরা চাইলে পরবর্তীতে নিয়ম করে অনিবন্ধিত দলকেও নিতে পারবে।’
রাজনীতি করা হেফাজতের মূল কাজ নয় বলে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য করার কারণ হলো, গত নির্বাচনে মানুষ মনে করেছে হেফাজত বিভক্ত হয়ে গেছে। তাদের নেতাদের মধ্যে মিল নেই। কিন্তু হেফাজত ভাগ হয়নি। বাহ্যিক বিভক্তি দূর করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হেফাজত চায়, সবাই এক প্ল্যাটফর্মে কাজ করুক।’