জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ নানা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে এখন বেশ সরব জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দল। গত সেপ্টেম্বর মাসে এই জোটের প্রথম লংমার্চ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জনসভা ও পথসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে নেতারা প্রয়োজনে সরকার পতনের ‘এক দফার’ ইঙ্গিত দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ৩১ অক্টোবর খুলনামুখী লংমার্চের ঘোষণা দিয়েছে ১১ দল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এমন পরিস্থিতিতে জামায়াতকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে হেফাজতে ইসলামকে কাছে টানার চেষ্টা করছে বিএনপি। দলটির একাধিক ঘনিষ্ঠ সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

শুধুমাত্র হেফাজত নয়, বরং বিভিন্ন ইসলামী দলের সঙ্গেও সম্পর্ক আরও জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। পারস্পরিক সহযোগিতা, নিয়মিত যোগাযোগ এবং মতবিনিময় বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী রাশেদ খান সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের আমিরের সঙ্গে কথা বলেছেন।

বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের দাবি, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য গড়ে তুলতে চায় দলটি। একই সঙ্গে মানবিকতা, শিক্ষা, উন্নয়ন, সামাজিক মূল্যবোধ এবং জনকল্যাণমূলক কাজে ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিএনপি নেতারা মনে করেন, দলটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তারা ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং আলেম-ওলামাদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে আসছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনি রাজনীতির স্বার্থে একাধিক ইসলামী সংগঠনের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক সমঝোতা ও জোট গঠন হয়েছে। তাই বর্তমান যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে তারা কোনো নতুন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন না, বরং একে দীর্ঘদিনের সম্পর্কেরই একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচনা করছেন।

এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি সবসময়ই ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস করে। ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিগত প্রতিটি আন্দোলনেও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ইসলামী দলগুলো আমাদের সঙ্গে ছিল। যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, প্রকৃত ইসলাম চর্চা করে এবং বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস রাখে, এমন দলগুলোকে নিয়ে দেশ গঠনের প্রত্যয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।’

বিএনপির নেতাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী রাজনীতির অঙ্গনে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য, পাল্টাপাল্টি প্রচারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। তাদের দাবি, এসব প্রচারণার একটি বড় অংশ পরিকল্পিতভাবে বিএনপির সঙ্গে ইসলামী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য করা হচ্ছে।

দলটির ধারণা, ইসলামের নাম ব্যবহার করে যদি কোনো ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তবে দায়িত্বশীল আলেম-ওলামা এবং ইসলামী সংগঠনগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যারা নৈতিকতা, ইসলামী মূল্যবোধ এবং জনকল্যাণমুখী রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করছে বিএনপি।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্র ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী। তাই ইসলাম ও দেশের স্বার্থে ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য করা ভুল হবে না। তবে যারা দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, যারা সবসময় মোনাফেকি করে, তাদের সঙ্গে কোনো ঐক্য নয়।’

বিএনপির নেতারা আরও জানান, হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শে পার্থক্য থাকলেও ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে পারস্পরিক সংলাপ ও যোগাযোগ অব্যাহত রাখা জরুরি বলে তারা মনে করেন।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে বিএনপির বর্তমান সম্পর্ক নিয়ে দলটির ভেতরে বিস্তারিত আলোচনা চলছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, বিভিন্ন পক্ষের রাজনৈতিক বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার জবাব তারা সংঘাতের মাধ্যমে দিতে চান না। বরং জনগণের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং কর্মসূচি স্পষ্ট করার মাধ্যমেই তারা এর জবাব দিতে চান।

বিএনপি চেয়ারম্যানের আরেক উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তো জামায়াতের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াতে চাই। কিন্তু তারা যদি হঠাৎ হঠাৎ ক্রস রোডে গিয়ে দিক পরিবর্তন করে, তাহলে কী করার আছে! ১৯৮৬ সালে বাঁক পরিবর্তন করে এরশাদের পাতানো নির্বাচনে যাওয়া, ১৯৯৬ সালে ইউটার্ন দিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আন্দোলন, এমনকি ২০০৭ সালেও বলেছে বিএনপির দায় আমরা নেব না। সবার আগে বাংলাদেশ চাই। ইসলামকে গুরুত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আমরা সুসম্পর্ক আরও নিবিড় করতে চাই।’

বিএনপি নেতাদের দাবি, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির লক্ষ্য কেবল রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণে এই সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে শিক্ষা, মানবিক সহায়তা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে তাদের ইতিবাচক ভূমিকার সুযোগ রয়েছে বলে তারা মনে করেন।

দলটির নেতাদের মতে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আলেম-ওলামা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং ইসলামী চিন্তাবিদদের যথাযথ সম্মানের বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায় বিএনপি।