স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চালিয়েছে কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি রাজনৈতিক দল। তবে এই বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। আগামী ৫ ডিসেম্বর পরবর্তী এক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এর মধ্যবর্তী সময়ে অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনাও চলবে বলে জানানো হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় অবস্থিত আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম (ঢাকা) মাদ্রাসায় সাত দলের লিয়াজোঁ কমিটির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় শামিল দলগুলো হলো— ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।

বৈঠকটিতে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয়ে বেলা একটা পর্যন্ত চলা এই বৈঠকে সাত দলের লিয়াজোঁ কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ, নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি মাওলানা আবদুল আউয়াল এবং হেফাজত আমিরের পুত্র মুফতি আইয়ুব বাবুনগরী।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আলোচনায় সাতদলীয় ঐক্যের সামগ্রিক কাঠামো, একটি অভিন্ন ব্যানারে কার্যক্রম পরিচালনা, অন্যান্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে কথা বলা হয়েছে। আগামী ৫ ডিসেম্বরের বৈঠকে ঐক্যের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে আরও আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা উল্লেখ করেন, জামায়াতে ইসলামী এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। এই পরিস্থিতিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে থাকা দলগুলো স্থানীয় নির্বাচনে কীভাবে অংশ নেবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কওমি ঘরানার সাত দলের এই ঐক্য প্রক্রিয়া সামনে এগোলে, ওই ১১-দলীয় জোটের দলগুলো নতুন এই ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না, তা নিয়েও কথা হয়েছে।

বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাত দল একসঙ্গে অংশ নিতে পারে কি না, সে বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ আলোচনাকে তাঁরা ইতিবাচকভাবে দেখছেন এবং স্থানীয় নির্বাচনে সাত দল জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলে তাঁরা এতে থাকবেন।”

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানও জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এ বিষয়ে আগামী ৫ ডিসেম্বরের বৈঠকে আরও আলোচনা হবে। এর মাঝে অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও হতে পারে।”

বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা জানান, সাতটি ইসলামি দল ‘সমমনা ইসলামী দল’ ব্যানারে একসঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা করছে। তবে এই ব্যানারে থাকলেও প্রতিটি দল তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখবে।

হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “‘সমমনা ইসলামী দল’ ব্যানারে দলগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিসের ভিত্তিতে ঐক্য হবে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে ঐক্যের কর্মপদ্ধতি এখনো ঠিক হয়নি। এ জন্য ৫ ডিসেম্বর আবার বৈঠক ডাকা হয়েছে।”

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ‘সমমনা ইসলামী দল’ নামে অভিন্ন ব্যানারে কার্যক্রম চালানোর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকা দলগুলোকে সেই জোট ছাড়তে হবে কি না, তা নিয়ে মতৈক্য হয়নি। বিশেষ করে অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকার শর্ত আরোপের বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি আপত্তি জানিয়েছে। তাদের মতে, এ বিষয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সাতদলীয় ঐক্যে থাকা কোনো দল অন্য কোনো জোটে থাকতে পারবে না মর্মে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। দলগুলোর মধ্যে যারা অন্য জোটে আছে, তাদের ওই জোট ছেড়ে আসতে অনুরোধ করেছে হেফাজতে ইসলাম। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।”

বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহারও জানান, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য থেকে কওমি ঘরানার দলগুলোকে বেরিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের নেতারা। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সমমনা ইসলামী দলের ব্যানারে তাঁরা থাকছেন। তবে তাঁরা জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ১১–দলীয় ঐক্যের আন্দোলনেও শরিক থাকবেন।”

হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সাত দল অন্য কোনো জোটে থাকতে পারবে না—এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে কোনো কোনো দল এ বিষয়ে নিজ নিজ দলীয় ফোরামে আলোচনা করে পরে জানাবে বলে জানিয়েছে।”

বৈঠক সূত্রে আরও জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির সঙ্গে দলগুলোর সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব এ সময় জানান, সাত দলের এই ঐক্য কার্যকর হলে তাঁরা বিএনপির জোট থেকে বেরিয়ে যাবেন।

রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে লিয়াজোঁ কমিটির আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান। তিনি জানান, অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকার শর্তটি শিথিল করা যায় কি না, সে বিষয়ে আরও আলোচনা হতে পারে।

এছাড়া বৈঠকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এক নেতা তাদের দলের আমির মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে নেতিবাচক বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং বই প্রকাশের বিষয়টি উত্থাপন করেন। হেফাজতের মহাসচিব এ ধরনের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান। পাশাপাশি হেফাজত নেতা হারুন আজিজীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতাদের নিয়ে আপত্তিকর স্ট্যাটাসের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এই বিষয়টি খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয় মুফতি আইয়ুব বাবুনগরীকে।

বৈঠকের শেষ পর্যায়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সাম্প্রতিক দুর্গাপূজার সময় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা করা হয়।