জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক জোট এখন আদর্শিক জোটে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করে দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন এক কেন্দ্রীয় নেতা। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক বিষয়ে নিজস্ব মতামতের কারণে দলীয় সহকর্মীদের কাছ থেকে ‘মুজিববাদী’ তকমা পাওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।

মো. আবদুর রহমান নামের ওই নেতা আজ শুক্রবার রাত ১০টার দিকে তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বরাবর একটি পদত্যাগপত্র পোস্ট করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবদুর রহমান এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের কেন্দ্রীয় সংগঠকের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

নিজের পদত্যাগপত্রে আবদুর রহমান লিখেছেন, ‘ঘোষিত লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, নতুন বন্দোবস্তের প্রত্যয় এবং বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতি অঙ্গীকার আমাকে এনসিপিকে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, এনসিপির নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গঠিত নির্বাচনী ও রাজনৈতিক জোটের ফলে কেন্দ্র থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত জামায়াতি আদর্শের বিস্তার লাভ করেছে। জামায়াত প্রশ্নে দলের বহু প্রতিষ্ঠাকালীন মেধাবী, পরিশ্রমী ও সম্ভাবনাময় নেতৃত্ব এনসিপি ত্যাগ করেছেন। রাজনৈতিক জোট এবং আদর্শিক জোট এক হবে না, এমন প্রত্যাশা থেকে আমি এনসিপির সঙ্গে থেকে যাই। কিন্তু দিনে দিনে সংগঠনের ভেতরে-বাইরে দ্বিচারিতা যেন বেড়েই চলেছে।’

জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক জোট এখন আদর্শিক জোট হিসেবে একাকার হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করে তিনি আরও লিখেছেন, ‘দলের একজন কর্মী হিসেবে এটি আমার মৌলিক আদর্শ ও চেতনার সঙ্গে চরমভাবে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে সহকর্মীদের বিমাতাসুলভ আচরণ (বিশেষ করে ঐতিহাসিক বিষয়ে আমার মতামতের জন্য মুজিববাদী ট্যাগ দেওয়া) আমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করে, যা সহকর্মীদের ব্যাপারে অস্বস্তিকর মনোভবের উদ্ভব ঘটায়। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বিষয়ে এনসিপির নেতা-কর্মীদের অবস্থান বর্তমানে জামায়াত-শিবিরের অবস্থানের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। ফলে আদর্শিক প্রশ্নেও এনসিপির স্বতন্ত্র অবস্থান বর্তমানে যেন জামায়াতের বয়ানের দ্বারাই আবর্তিত হচ্ছে। এমন অবস্থায় আমার পক্ষে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করা নৈতিক ও আদর্শিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে আমি এনসিপির সঙ্গে পথচলা এখানেই সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সব ধরনের সাংগঠনিক দায়িত্ব ও পদ থেকে স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে পদত্যাগ করছি।’

উল্লেখ্য, আবদুর রহমান একসময় ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১৯ সালে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০২২ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বর্ধিত কমিটিতে সদস্য হিসেবে মনোনীত হন তিনি। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তিনি এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপির প্রাথমিক প্রার্থী তালিকায় তাঁর নাম ছিল এবং শরীয়তপুর-১ আসনে তিনি দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন। তবে পরবর্তীতে এনসিপি ১১-দলীয় ঐক্যের শরিক হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাঁকে আর মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।

দল ছাড়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে আবদুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে যখন জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি জোটবদ্ধ হয়, তখন এটিকে সাময়িক জোট বলা হয়েছিল। রাজনৈতিক জোট গঠন হতেই পারে। কিন্তু এখন জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির বয়ানে কোনো পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না। আদর্শগতভাবে যেন দুই দল মিলে যাচ্ছে।’

গত ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ায় এনসিপির কিছু নেতা তাঁকে ‘আওয়ামী লীগ’ বলে ট্যাগ দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে আবদুর রহমান বলেন, ‘অথচ আমরা আন্দোলনের সময় “বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই” বলে স্লোগান দিয়েছি।’ রাজনৈতিক সহকর্মীদের কাছ থেকে এমন তকমা পাওয়ার ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক যাত্রা হয়তো এখানেই শেষ হচ্ছে।’

অন্যদিকে, আবদুর রহমানের পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার রাতে মুক্তকণ্ঠকে জানান, ‘আবদুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, দেশের বাইরে চলে গেছেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে তাঁকে মত উৎপাদন করতে দেখা যায়। এ কারণে তাঁকে ঘোষিত হতে যাওয়া পুনর্গঠিত কমিটিতে রাখা হবে না, এটা জানার পর ফেসবুকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। মূলত দলে রাখা হচ্ছে না, এটি টের পেয়ে ফেসবুকে পদত্যাগের এই নাটক করেছেন।’