প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়তে অতিরিক্ত চিনি, লবণ এবং সম্পৃক্ত চর্বির উপস্থিতি সহজে শনাক্ত করতে মোড়কের সামনের অংশে সতর্কবার্তা দেওয়ার পক্ষে জনসচেতনতা তৈরিতে দুই মাসব্যাপী একটি বিশেষ প্রচারণা শুরু হয়েছে। আজ রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সভাকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই প্রচারণার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
আয়োজকদের মতে, প্যাকেটের সামনের অংশে সতর্কতামূলক লেবেল বা ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) থাকলে ভোক্তারা খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে ওই খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে কি না। এর ফলে সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া অনেক সহজ হবে। পাশাপাশি এই বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগকে সহায়তা করাই এই প্রচারণার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
এই উদ্যোগটি যৌথভাবে গ্রহণ করেছে প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান), ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন, ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্ট, কোয়ালিশন ফর হেলদি ফুড এবং সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স (সিএলপিএ)।
বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী এই অসংক্রামক রোগগুলো। এর মধ্যে হৃদ্রোগ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস অন্যতম প্রধান সমস্যা। এছাড়া একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ অতিরিক্ত ওজনের এবং ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ স্থূলতার সমস্যায় ভুগছেন। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা সরাসরি হৃদ্রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
প্যাকেটের সামনের অংশে সতর্কতামূলক লেবেল থাকলে পুষ্টিগুণ ও ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। বিশেষ করে অষ্টভুজ আকৃতির সতর্কবার্তার মাধ্যমে পুষ্টি-সংক্রান্ত তথ্যগুলো স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, যা ভোক্তাদের খাবার কেনার সময় সঠিক ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। আয়োজকদের দাবি, এ ধরনের লেবেলিং অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের প্রবণতা কমিয়ে খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম। প্রচারণার উদ্বোধন করে তিনি বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত অস্বাস্থ্যকর মোড়কজাত খাদ্য ও পানীয় সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে মোড়কের সামনে সতর্কবার্তা (এফওপিএল)–সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রবিধানমালা প্রণয়নে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ।’
আয়োজক প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, আগামী দুই মাস ধরে টেলিভিশন, রেডিও, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ও মুদ্রিত সংবাদপত্র এবং গুগল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই প্রচারণা চালানো হবে। প্রচারণার জন্য ভিডিও ও অডিও বিজ্ঞাপন, স্থিরচিত্র এবং বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক উপকরণ ব্যবহার করা হবে। এছাড়া অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পাতাতেও এসব উপকরণ প্রচার করা হবে।
এই প্রচারণার মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষ যেন প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়তে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বির উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। সেই সঙ্গে প্যাকেটজাত খাদ্য ও পানীয়র মোড়কের সামনের অংশে সতর্কতামূলক লেবেল চালুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রবিধানমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর সহায়তা প্রদান করা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্যশিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েব এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগের পরিচালক ইকবাল মাসুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক সাইফুদ্দিন আহমেদ, প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের এবং সিএলপিএর সেক্রেটারি সৈয়দ মাহবুবুল আলম।