শীত হোক কিংবা গ্রীষ্ম— সব ঋতুতেই বাঙালির পাতে বেগুন থাকবে। গরম ভাতের সঙ্গে মচমচে বেগুন ভাজা, বেগুন পোড়া ভর্তা, আলু-বেগুনের চচ্চরি কিংবা ছুটির দিনে ইলিশ-বেগুনের ঝোল। রান্নাঘরের এই অতি পরিচিত সবজিটি আমাদের অনেকেরই ভীষণ প্রিয়।
তবে সমস্যাটি তৈরি হয় কাটার মুহূর্তে। বাজার থেকে খুব ভালো করে দেখে বেগুন কিনে আনলেন, অথচ কাটতে গেলেই চোখে পড়ে ছোট ছোট কালো গর্ত কিংবা পোকা। বেগুন কাটার সময় এমন দৃশ্য দেখে অনেকেরই মন খারাপ হয়ে যায়। তখন অনেকেই পোকা লাগা বা নষ্ট অংশটুকু কেটে ফেলে দেন, তারপর বাকি বেগুনটা ধুয়ে রান্না করে ফেলেন। আবার অনেকে নিজেকে সান্ত্বনা দেন এই ভেবে যে- বেগুনে পোকা আছে মানে এই বেগুনে একটুও কীটনাশক বা রাসায়নিক দেওয়া হয়নি, একদম প্রাকৃতিক।
কিন্তু পোকা খাওয়া বেগুন কি আদৌ আমাদের শরীরের জন্য নিরাপদ? চলুন জেনে নিই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদরা এ নিয়ে কী বলছেন।
বেগুনে সাধারণত কোন ধরনের পোকা থাকে?
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বেগুনে মূলত ‘ফ্রুট অ্যান্ড শুট বোরার’ নামের এক ধরনের পোকার উপদ্রব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই পোকাগুলো সাধারণত বেগুনের গায়ে খুব সূক্ষ্ম ছিদ্র করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরপর আর বাইরে বের হয় না, বেগুনের ভেতরেই ডিম পাড়ে এবং বংশবৃদ্ধি চালিয়ে যেতে থাকে। ফলে আমরা বাইরে থেকে বেগুনটা যতই চকচকে দেখি না কেন, কাটার আগে ভেতরে পোকা আছে কি না তা বোঝার উপায় থাকে না।
পোকা ধরা অংশ কেটে বাদ দিলেই কি ঝুঁকি শেষ?
অনেকেই মনে করেন, পোকা ধরা অংশটুকু কেটে ফেলে দিলে আর কোনো ঝুঁকি থাকে না। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। খালি চোখে আমরা বেগুনের যতটুকু অংশে কালো দাগ বা পোকা খাওয়া দেখতে পাই, সেই অংশ ছাড়াও আরও অনেক দূর পর্যন্ত সংক্রমণ ছড়িয়ে থাকে। এগুলো খালি চোখে দেখা যায় না।
ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস বাসা বাঁধে
পোকা যখন বাইরে থেকে বেগুনের ভেতরে প্রবেশ করে, তখন তার সংস্পর্শে এসে বেগুনের ভেতরে নানা ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া এবং ফাঙ্গাস জন্মাতে শুরু করে। খালি চোখে এগুলো হয়তো দেখা যায় না, কিন্তু তার জীবাণু ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ বেগুনের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে।
বিষাক্ত উপাদান বা মাইকোটক্সিন
পোকার মলমূত্র এবং তাদের শরীর থেকে নিঃসৃত রস বেগুনের নরম অংশের সঙ্গে মিশে এক ধরনের ক্ষতিকর ‘মাইকোটক্সিন’ তৈরি করতে পারে। সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, এই টক্সিনগুলো রান্না করার পরও সহজে নষ্ট হয় না। এর বিষাক্ততা থেকেই যায়।
অ্যালার্জি ও পেটের সমস্যা
পোকা খাওয়া বেগুন খেলে যে তাৎক্ষণিকভাবেই অসুস্থ হয়ে যাবেন তা কিন্তু নয়। তবে যাদের ত্বক একটু সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে অ্যালার্জি, চুলকানি বা র্যাশের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া ফুড পয়জনিং, পেটে তীব্র ব্যথা, বমি বমি ভাব কিংবা ডায়রিয়ার মতো সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে।
বেগুনে পোকা আছে কি না তা বোঝার সহজ উপায়
বাজার করতে গেলে অনেক সময় আমরা বিভ্রান্ত হয়ে যাই। তবে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে কয়েকটি ছোট বিষয় মাথায় রেখে বাজার করলে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব-
• বেগুন কেনার সময় ভালো করে দেখে নিন সেটির গায়ে কোনো ছোট ছিদ্র, দাগ বা কালো ছোপ রয়েছে কি না।
• মনে রাখবেন, তাজা ও ভালো বেগুন আকারের তুলনায় ওজনে বেশ হালকা হয়। বেগুন যদি আপনার হাতে একটু বেশি ভারী মনে হয়, তাহলে বুঝবেন ভেতরে হয়তো বিচি বেশি আছে কিংবা পোকা থাকতে পারে।
• তাজা বেগুনের বোঁটা সবসময় সবুজ এবং টাটকা দেখাবে। বোঁটা যদি শুকিয়ে গিয়ে কালচে হয়ে যায়, তবে বুঝে নেবেন সেটি তাজা না। ওই ধরনের বেগুন না কেনাই ভালো।
কখন বেগুন কেটে ফেলে বাকি অংশ খাবেন?
রান্নার আগে বেগুন কাটার সময় যদি দেখা যায় খুব সামান্য জায়গায় পোকার দাগ রয়েছে এবং বাকি বেশিরভাগ অংশটি একদম ধবধবে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, তবে সেক্ষেত্রে পোকার অংশটি কেটে ফেলে বাকিটা খেতে পারেন। পোকার অংশটি একটু বেশি করেই কেটে বাদ দিন। এরপর ভালো করে লবণ-হলুদ পানিতে ধুয়ে তা ব্যবহার করতে পারেন।
কিন্তু বেগুনের ভেতরে যদি বেশিরভাগ অংশ জুড়েই পোকার বিস্তার ঘটে থাকে কিংবা বেগুনটি ভিতর থেকে কালচে ও নরম হয়ে যায়, তবে সেটি পুরোটাই ফেলে দিন। সামান্য কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবেন না। নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্যের কথা সবার আগে ভাবুন।
বেগুন দীর্ঘদিন ভালো রাখবেন যেভাবে
বাজার থেকে ফ্রেশ বেগুন কিনে আনলেন, কিন্তু ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে না পারলে তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সঠিক নিয়মে সংরক্ষণ করলে বেগুন বেশ কিছুদিন তাজা রাখা সম্ভব।
• প্লাস্টিকের প্যাকেটে রাখবেন না: বাজার থেকে এনেই প্লাস্টিকের এয়ারটাইট প্যাকেটে রেখে দেবেন না। এতে বেগুন ঘামে এবং দ্রুত পচে যায়।
• স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ: কিনে আনার পর যদি ২-৩ দিনের মধ্যে রান্না করার পরিকল্পনা থাকে, তবে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় খোলা জায়গায় রেখে দিন। সরাসরি রোদ পড়ে এমন জায়গায় রাখবেন না।
• ফ্রিজে রাখার নিয়ম: ফ্রিজে রাখতে চাইলে বেগুনের গায়ে বাতাস চলাচলের জায়গা রেখে পেপার টাওয়েল বা পেপারে মুড়িয়ে ভেজিটেবল ড্রয়ারে রাখুন। এতে বেগুন প্রায় ১ সপ্তাহ পর্যন্ত ভালো থাকবে।
• কাটা বেগুন সংরক্ষণ: বেগুন কেটে ফেললে খুব দ্রুত তার রঙ কালো হতে শুরু করে। তাই কাটার পর সামান্য লবণ ও হলুদ মেশানো পানিতে ডুবিয়ে রাখুন, এতে রঙ পরিবর্তন হবে না।
সূত্র: টিভি ৯ বাংলা , উইকিহাউ