নোয়াখালীর হাতিয়ায় সরকারি বেড়িবাঁধের জমি দখল করে অবৈধ বসতি গড়ে তোলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় তাঁতী দল নেতা মো. হারুনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, ওই জমিতে অবৈধভাবে ঘর বসানোর সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে তিনি জনপ্রতি ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেক পরিবারই মাটি কেটে সেখানে ঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাতিয়ার হরণী ইউনিয়নে টাংকির বাজার থেকে চেয়ারম্যানঘাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধের প্রায় আড়াই কিলোমিটার অংশ এখন দখলের কবলে। দখলকৃত বাঁধের দুই পাশে গড়ে উঠেছে টিনের দোচালা-চারচালা ঘর ও ঝুপড়ি বসতি। প্রায় ২০ থেকে ২৫টি পরিবার সম্প্রতি মাটি কেটে সেখানে বসতি স্থাপন করেছে। তবে এসব বসতির মধ্যে একটি ঘর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া, যেখানে স্বামীহারা এক নারী তার ছয় ও আট বছর বয়সি দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন। স্থানীয়দের দাবি, বাকি বসতিগুলোর অধিকাংশ মানুষই আশপাশের এলাকা থেকে আসা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিএনপির সহযোগী সংগঠন তাঁতী দলের ওয়ার্ড সভাপতি মো. হারুন এবং স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা এই অবৈধ বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দিচ্ছেন। এর বিনিময়ে তারা ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ গ্রহণ করছেন। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন হরণী ইউনিয়ন তাঁতী দলের ওয়ার্ড সভাপতি মো. হারুন, একই ইউনিয়নের রহমান আলী ওরফে রহম চৌকিদারের ছেলে নুরনবী বাহিনীর প্রধান নুরনবী এবং ওয়ার্ড বিএনপির সমর্থক আব্দুল বারেক ও আব্দুল বাসেতসহ তাদের সহযোগীরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে নদীভাঙন রোধ করার লক্ষ্যে টাংকির বাজার থেকে দিদার বাজার, চেয়ারম্যানঘাট হয়ে নলের চর পর্যন্ত মোট ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। এই নির্মাণ কাজে ব্যয় করা হয় চার কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার অংশ ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট আড়াই কিলোমিটার বাঁধের পাশের জায়গায় এখন দখল ও বসতি নির্মাণের ফলে বাঁধটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

অন্যদিকে, বাঁধ নির্মাণের জন্য যে জমি দেওয়া হয়েছিল, সেই জমির মালিকদের দাবি—জমির মালিকানাসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সমাধান না করেই বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করা হয়েছে। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এরই মাঝে জমি দখল করে অবৈধ বসতি গড়ে তোলা হয়েছে বলে তারা জানান।

বেড়িবাঁধের পাশের বাসিন্দা যোগেশ চন্দ্র সাহা বলেন, “সরকার তার জমির ওপর দিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলেও তিনি কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি।” তার অভিযোগ, বিএনপি নেতা হারুন ও নুরনবী ৪০ হাজার টাকা করে নিয়ে ওই বেড়িবাঁধের জমি বন্দোবস্ত দিচ্ছেন। তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে তাকে মারধর করে টুকরো টুকরো করে নদীতে ফেলে মাছকে খাওয়ানোর হুমকি দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর থেকে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং ভয়ে নিজের বাড়িতে না থেকে অন্যত্র রাত কাটাচ্ছেন।

নিরুমা রানী সাহা নামের এক বৃদ্ধা জানান, জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ না দিয়েই জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিষ্পত্তি না করে নতুন করে ঘর তুলে জমি দখল করা হচ্ছে, যার ফলে তিনি নিজের খতিয়ানভুক্ত জমি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, “এ বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি। সবশেষ জমি দখল নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে নুরনবীসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অভিযোগও দিয়েছি। একজন এসআই অভিযোগটি তদন্ত করছেন।”

এই অভিযোগের বিষয়ে তাঁতী দল নেতা মো. হারুন দাবি করেছেন, বেড়িবাঁধের পাশের জমি দখল করে কাউকে বসতি গড়ার সুযোগ করে দেওয়া কিংবা এজন্য টাকা নেওয়ার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তার দাবি, “শ্রমিক হিসেবে মাটি কাটার কাজ করতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। দুই দিন মাটি কাটার কাজ করার পর তৃতীয় দিন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। দলের কিছু লোক তার বিরুদ্ধে লেগেছে।”

ইউনিয়ন তাঁতী দলের সভাপতি মো. আলমগীর জানান, তিনি এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছেন। তিনি বলেন, “অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সরেজমিনে পরিদর্শন করব। অভিযোগের সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়, এমন কাউকে দলে রাখা হবে না।”

স্থানীয় বিএনপির সাবেক সভাপতি আক্তারুজ্জামান দোলন জানান, অভিযোগের বিষয়টি জানার পর তিনি সরেজমিনে গিয়ে অভিযুক্ত নুরনবীকে এলাকা ছাড়া করেছেন। তাঁতী দলের সভাপতি হারুনের বিষয়ে দলীয় তদন্ত চলছে এবং সত্যতা যাচাই করে দলীয় নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাতিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জামিল আহমেদ পাটোয়ারী বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে ওই এলাকার জমি অধিগ্রহণ করে ব্লক নির্মাণের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। নদী ও বেড়িবাঁধের পাশের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ব্লক স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শুরু হলে ওই এলাকায় দখলকৃত বাড়িঘর থাকবে না। তবে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিষয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।”

জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে রাজি না হলেও জানান, তিনি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।