পিরোজপুরের কাউখালীতে অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশ সদস্যের স্ত্রী জেসমিন বেগমের (৪৮) মরদেহ উদ্ধার এবং তাকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে জেলা তাঁতী দল নেতা মানিক হাওলাদারকে (৫০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার প্রধান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত মানিককে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশ জানিয়েছে, রোববার (৪ অক্টোবর) রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এবং তথ্যপ্রযুক্তির বিশেষ সহায়তায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৮) এর সদস্যরা মাদারীপুর জেলার সদর থানা এলাকায় অভিযান চালায়। এই অভিযানের মাধ্যমেই মানিক হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত মানিক হাওলাদার পিরোজপুর জেলা জাতীয়তাবাদী তাঁতিদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নিহত জেসমিন বেগমের পরিবারের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের দাবি, জেসমিনকে প্রথমে ধর্ষণ করা হয় এবং পরবর্তীতে তাকে হত্যা করা হয়। এছাড়া ঘর থেকে স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, ধর্ষণ ও হত্যার প্রকৃত কারণ এবং বিস্তারিত বিষয়গুলো তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বরিশালের এসআরবি-৮ এর সহকারী পুলিশ সুপার ও মিডিয়া অফিসার ওয়ালিদ হাসান মিঠু আজ সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশি সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকালে কাউখালী উপজেলার শিয়ালকাঠি গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে জেসমিন বেগমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার আগের রাতে তিনি বাড়িতে একাই ছিলেন। সকালে স্বজনেরা লক্ষ্য করেন যে বাড়ির পেছনের দরজা খোলা। ঘরে ঢুকে তারা দেখেন আসবাবপত্র, আলমারি ও ওয়ারড্রবসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে। জেসমিনকে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে অবশেষে ঘরের একটি কক্ষে তার মরদেহ দেখতে পান স্বজনেরা। তারা আরও জানান, ঘরের মেঝেও ভেজা অবস্থায় ছিল।
মৃত জেসমিন বেগম ওই গ্রামেরই মৃত আফজাল খানের বড় মেয়ে এবং অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য কেরামত আলীর স্ত্রী। কয়েক বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি তার ছোট মেয়েকে নিয়ে ওই বাড়িতে বসবাস করছিলেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন তিনি বাড়িতে একাই ছিলেন। ময়নাতদন্ত শেষে রাতে জানাজা সম্পন্ন করে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
নিহতের ভাই নাজির হোসেন অভিযোগ করে বলেন, তার বোনকে ধর্ষণের পর পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার দাবি, প্রধান অভিযুক্ত মানিকের কাছে জেসমিনের প্রায় ছয় লাখ টাকা পাওনা ছিল। হত্যার পর ঘর থেকে স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার ভবানীপুর এলাকার মানিক হাওলাদারের সঙ্গে এক সময় জেসমিনের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তবে পাওনা টাকা চাওয়া নিয়ে গত কিছুদিন ধরে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছিল বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
মায়ের করুণ মৃত্যুতে ভেঙে পড়া মেয়ে কাকন মনি ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে বলেন, “আমার মাকে যারা ধর্ষণ ও নির্যাতন করে হত্যা করেছে আমি সরকারের কাছে ন্যায়বিচার পাইতে তাদের ফাঁসি দাবি করছি”।
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জেলা বিএনপির সদস্য সচিব সাইদুল ইসলাম কিসমত বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের আমরা বিচার চাই। মানিকের যদি এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় তাহলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কাউখালী থানার পুলিশ পরিদর্শক এবাদ আলী জানান, ঘটনার পর পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তার নির্দেশনায় নেছারাবাদ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার প্রণয় রায় এবং কাউখালী থানার ওসি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের সহযোগিতায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
কাউখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জানান, থানায় হত্যা মামলা রুজু করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর জেসমিনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।