কক্সবাজারের টেকনাফে শাহপরীর দ্বীপের বেড়িবাঁধ ও সীমান্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে সিসি ব্লক সরে গিয়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রায় দেড়শো কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামোটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন উপকূলবাসী। দ্বীপের বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এই ভাঙনের ফলে অন্তত ৪০০ বসতবাড়ি সাগরে তলিয়ে যেতে পারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে দ্বীপটির পশ্চিমপাড়া অংশের প্রায় এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়েছিল। ২০২০ সালে ওই অংশসহ মোট দুই কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামত করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দিতে পারেনি। প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একাধিক দফায় সংস্কারের পরও নয়াপাড়া, কাটাবুনিয়া ও হারিয়াখালী এলাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০২২ সালে ১৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধের ওপর নতুন করে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করা হয়। তবে বর্তমানে এই সড়কটি পুনরায় ভাঙনের মুখে পড়ায় ডাঙ্গরপাড়া, মাঝেরপাড়া, দক্ষিণপাড়া ও ঘোলাপাড়ার অন্তত চারশ বসতবাড়ি বিলীন হওয়ার সরাসরি ঝুঁকিতে পড়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে শাহপরীর দ্বীপের ২ দশমিক ৬৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য প্রায় ১৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যৌথ তত্ত্বাবধানে ২০১৭ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০২২ সালের জুন মাসে শেষ হয়। এর আগে সংস্কারহীন বাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশের ফলে টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপ সড়কের হারিয়াখালী থেকে উত্তরপাড়া পর্যন্ত চার কিলোমিটার পাকা সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৮ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) ৬৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ওই সড়কের ৫ দশমিক ১৫ কিলোমিটার অংশ নতুন করে নির্মাণ করে এবং ২০২২ সালের নভেম্বরে তা যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

বাসিন্দারা জানান, উত্তাল ঢেউয়ের ধাক্কায় সীমান্ত সড়কের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। বাঁধের ঢালুতে বসানো সিসি ব্লকের নিচের মাটি ধসে যাওয়ায় ব্লকগুলো সরে যাচ্ছে। শাহপরীর দ্বীপের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কলিম উল্লাহ বলেন, "১৯৯০ সালেও শাহপরীর দ্বীপের দৈর্ঘ্য ছিল ১৪ কিলোমিটার আর প্রস্থ ৯ কিলোমিটার। লোকসংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার। সাগরে বিলীন হতে হতে এখন দ্বীপটির দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৩ কিলোমিটারে ঠেকেছে। শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিম ও দক্ষিণাংশে প্যারাবন সৃষ্টির সুযোগ না থাকায় বঙ্গোপসাগরের ঢেউ সরাসরি বেড়িবাঁধে আঘাত হানছে। তাতে বাঁধের পশ্চিম পাশের সিসি ব্লক সরে গিয়ে নিচের মাটির বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। আবার বসতবাড়ি বিলীনের ঝুঁকিতে পড়েছে হাজারো মানুষ।"

তিনি আরও বলেন, "জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা বেড়েছে। লঘুচাপ কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত পড়লে জোয়ারের পানি বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। জোয়ার ঠেকাতে এই বাঁধের উচ্চতা আরও অন্তত চার ফুট বাড়ানো দরকার।"

দ্বীপের জেলে নজির আহমদ (৫৫) জানান, ১৯৯১ সালে তার বাড়ি সাগরের ৭০০ মিটার দূরে ছিল, গত তিন দশকে তাকে চারবার বসতবাড়ি সরাতে হয়েছে। তিনি বলেন, "পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে ভাঙন দেখে গেলেও সংস্কারের উদ্যোগ নিচ্ছে না। উচ্চ জোয়ারের লোনাপানি বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে ঢুকে লোকজনের ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি প্লাবিত করছে। তাতে খেতের ফসল ও গাছপালা মরে যাচ্ছে।"

মাঝেরপাড়ার জেলে আহমদ আলী (৬০) বলেন, "আমরা গরিব মানুষ। কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। যাদের জমি আছে, তারা আগেভাগে চলে যাচ্ছেন। ত্রাণ নয়, আমরা বেড়িবাঁধ চাই।"

ঘোলারচরের বাসিন্দা আরিফুর রহমান জানান, বেড়িবাঁধের বাইরে ৩৩টি পরিবারের প্রায় আড়াই শতাধিক মানুষ কোনো ধরনের সুরক্ষা ছাড়াই জীর্ণ জীবনযাপন করছেন। সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান অভিযোগ করেন, "বাঁধটি প্রতিবার নির্মাণ করার সময় এলাকার মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। আগামীতে ভালোভাবে বাঁধ নির্মাণ করার জন্য তাগাদা দেওয়া হবে।"

পাউবো টেকনাফের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী রিফাত ইবনে রশিদ জানান, উত্তাল ঢেউয়ের ধাক্কায় সিসি ব্লক উপড়ে পড়ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কারের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে।

পাউবোর কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, "লোকালয়ে যেন সাগরের পানি ঢুকতে না পারে, এ কারণে জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে মেরামতের কাজ শুরু হবে। তবে স্থায়ীভাবে সংস্কার কাজ শুরু হবে নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে, সাগর শান্ত হলে। উত্তাল পরিস্থিতিতে কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ।"