সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আরিফুর রহমান শান্তর ফেসবুক পোস্ট ঘিরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য শিল্পী রানী মোদক দায়ী থাকবেন’ এবং ‘আই রিজাইন ফ্রম অ্যাডমিন ক্যাডার’।
গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) মধ্যরাতে ‘AC Land Jamalganj’ নামের একটি ফেসবুক পেজে এই দুটি পোস্ট প্রকাশ করা হয়। তবে পরবর্তীতে পোস্টগুলো মুছে ফেলা হয়। বর্তমানে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
জামালগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিল্পী রানী মোদক জানান, পোস্টগুলো প্রকাশের পর প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল যে ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়েছে। তবে পরে তিনি জানতে পারেন, এসিল্যান্ডের স্ত্রী নিজেই পোস্ট দুটি মুছে দিয়েছেন। বিষয়টি দ্রুত জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পোস্ট প্রকাশের পর জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বন্দে আলী পুলিশ নিয়ে এসিল্যান্ডের বাসভবনে যান। সেই সময় ভীমখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান এবং স্থানীয় সাংবাদিক ওয়ালী উল্লাহ সরকারসহ আরও কয়েকজন সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এসিল্যান্ডের স্ত্রী জানান, তার স্বামী অসুস্থ। এরপর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন চিকিৎসক সেখানে গিয়ে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হলেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় রাতেই তাকে সিলেটে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে চিকিৎসকেরা তাকে ঢাকায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে তিনি রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ইউএনও শিল্পী রানী মোদক জানান, এসিল্যান্ড তার স্ত্রীকে নিয়ে ইউএনওর মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। কেক কাটার পর থেকেই তিনি অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন। অভিযোগ উঠেছে, ওই সময়ে তিনি ইউএনওর নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্যদের গায়ে হাত তোলেন।
শিল্পী রানী মোদক আরও জানান, এসিল্যান্ডের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন যে, তাকে নিয়মিত দুটি ঘুমের ইনজেকশন দিতে হয়। কিন্তু জামালগঞ্জের কোনো ফার্মেসিতে ওই ইনজেকশন পাওয়া যাচ্ছিল না। এসিল্যান্ডের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে ইউএনওর উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। এরপর তিনি পুলিশ ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাকে (আরএমও) ফোন করেন এবং তাদের সহায়তায় এসিল্যান্ডকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ইউএনওর ভাষ্যমতে, এসিল্যান্ডের পরিবারের সদস্যরা তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে জানিয়েছেন। বর্তমানে তাকে ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, আরিফুর রহমান শান্ত প্রায় দুই মাস ধরে জামালগঞ্জে দায়িত্ব পালন করছেন। শুক্রবার ইউএনও শিল্পী রাণী মোদকের মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর থেকেই তার আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আনসার সদস্যদের মারধর করেন, বাসায় গিয়ে গ্লাস ভাঙচুর করেন এবং শিশুদের গায়ে হাত তোলেন।
স্থানীয় সাংবাদিক ওয়ালী উল্লাহ সরকার জানান, শনিবার রাতে এসিল্যান্ডের আচরণ দেখে তার অসুস্থ মনে হয়েছে। তিনি সামনে যাকে পেয়েছেন, তার সঙ্গেই খারাপ আচরণ করেছেন বলে দাবি করেন ওয়ালী উল্লাহ। এসিল্যান্ডের স্ত্রী জানিয়েছিলেন যে, ইনজেকশন দিলে তিনি স্বাভাবিক হয়ে যাবেন, কিন্তু জামালগঞ্জে সেই ইনজেকশন পাওয়া যায়নি।
ভীমখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান বলেন, ওসি ও ইউএনওর উপস্থিতিতে এসিল্যান্ডের স্ত্রী তার স্বামী অসুস্থ বলে জানিয়েছিলেন। মাঝেমধ্যে তার এমন আচরণ হয় বলেও স্ত্রী জানিয়েছেন। নিয়মিত ব্যবহারের ইনজেকশন না পাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তাদের ধারণা।
চেয়ারম্যান আরও জানান, এসিল্যান্ডের সঙ্গে তার নিয়মিত দেখা হতো। কিন্তু ওই রাতে এসিল্যান্ড তাকে চিনতে পারেননি; বরং পরিচয় জানতে চেয়েছেন এবং জমিজমাসংক্রান্ত কোনো সমস্যা থাকলে সমাধান করে দেওয়ার কথা বলেছেন।
জামালগঞ্জ থানার ওসি মো. বন্দে আলী জানান, ইউএনওর ফোন পেয়ে তিনি পুলিশ নিয়ে এসিল্যান্ডের বাসায় যান। তার স্ত্রীর কথামতো ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। পরে ইনজেকশনের কথা জানানো হলে জামালগঞ্জে তা পাওয়া যায়নি। এরপর রাত একটার পর এসিল্যান্ডকে সিলেটে পাঠানো হয়।