সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলায় সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) আরিফুর রহমানের আকস্মিক মানসিক অসুস্থতা এবং ফেসবুকে রহস্যজনক পোস্ট দেওয়ার ঘটনা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। গতকাল শুক্রবার রাত পৌনে ১১টার দিকে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পর পর দুটি পোস্ট করেন, যাতে লেখা ছিল— “আমার মৃত্যুর জন্য শিল্পী রানী মোদক (ইউএনও) দায়ী থাকবে” এবং “আই রিজাইন ফ্রম অ্যাডমিন ক্যাডার”। এই পোস্টগুলো দেখার পরপরই পুলিশসহ স্থানীয় অনেকেই দ্রুত এসিল্যান্ডের বাসভবনে ছুটে যান।
ঘটনার পর অসুস্থ আরিফুর রহমানকে প্রথমে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাঁকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তবে সেখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ঢাকায় নিয়ে গেছেন।
জানা গেছে, আরিফুর রহমান প্রায় দুই মাস আগে জামালগঞ্জে এসিল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন এবং তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে উপজেলা সদরেই বসবাস করছেন।
এই পুরো বিষয়টি নিয়ে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিল্পী রানী মোদক মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেছেন। মুঠোফোনে তিনি জানান, এসিল্যান্ড মানসিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ। গতকাল রাতে উপজেলা সদরে যা ঘটেছে, তা সবাই প্রত্যক্ষ করেছেন।
ফেসবুক পোস্টে কেন তাঁর নাম উল্লেখ করা হলো, সেই প্রশ্নে শিল্পী রানী মোদক বলেন, “এটা আমারও প্রশ্ন। আমি নিজেও বুঝতে পারছি না। পোস্ট দেওয়ার ছয় মিনিট আগেও তিনি আমার বাসায় ছিলেন। উনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসার পর কথা বলি, এরপর সংবাদ সম্মেলনে করে বিস্তারিত জানাব।”
ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে ইউএনও জানান, গতকাল শুক্রবার ছিল এসিল্যান্ডের তিন বছর বয়সী মেয়ের জন্মদিন। রাতে তাঁর স্ত্রীসহ আরিফুর রহমান ইউএনওর বাসায় জন্মদিনের কেক কাটার আয়োজনে অংশ নেন। কিন্তু সেই বাসা থেকে বের হয়েই তিনি ফেসবুকে বিতর্কিত পোস্টগুলো করেন। এরপর পুলিশসহ অনেকে তাঁর বাসায় গিয়ে দেখেন, তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক সেখানে আসেন এবং তাঁকে ওষুধ দেওয়া হয়, তবে তা সত্ত্বেও তাঁর অস্বাভাবিক আচরণ অব্যাহত থাকে। এরপর তাঁর স্ত্রী তাঁকে সিলেটে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রাতেই প্রথমে সিলেটের বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে আজ শনিবার স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা তাঁকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং ভোর তিনটার দিকে সেখানে পৌঁছানোর কথা ছিল।
ইউএনও শিল্পী রানী মোদক আরও জানান, এসিল্যান্ড আরিফুর রহমানের স্ত্রীর কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন যে, আরিফুরের মানসিক সমস্যা আগে থেকেই ছিল। এছাড়া তিন দিন আগে জামালগঞ্জে পানিতে ডুবে একটি শিশুর মৃত্যু হয়। ওই মৃত শিশুর মরদেহ দেখার পর থেকেই তিনি প্রচণ্ড ট্রমাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এই মানসিক অবস্থার প্রভাবেই গতকাল রাতে এসিল্যান্ড একজন আনসার সদস্যকে মারধর করেন এবং ইউএনওর মেয়েকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এছাড়া রাস্তায় যাঁকেই পেয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে তিনি অত্যন্ত অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন বলে জানা গেছে।
ফেসবুক পোস্ট দেখার পর এসিল্যান্ডের বাসায় গিয়েছিলেন জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বন্দে আলী। তাঁর ভাষ্যমতে, আরিফুর রহমানকে তখন মানসিক বিকারগ্রস্ত মনে হয়েছে। সেই সময় সেখানে সাংবাদিক এবং জনপ্রতিনিধিসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। স্ত্রীর অনুরোধে এসিল্যান্ডকে একটি ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়, কিন্তু ওষুধের পাওয়ার কম থাকায় তা কার্যকর হয়নি। এরপর একটি ইনজেকশন দেওয়ার কথা থাকলেও তা পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত রাত একটার দিকে তাঁকে সিলেটে পাঠানো হয়।
এসিল্যান্ডের এমন অদ্ভুত আচরণ জামালগঞ্জে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনার পর থেকে তাঁর দাপ্তরিক মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ রাখা হয়েছে। বিষয়টি রাতেই জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন ইউএনও শিল্পী রানী মোদক।