ফুটবল বিশ্বের মহাতারকা লিওনেল মেসি তার অর্জনের ঝুলিতে আরও একটি মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি যুক্ত করেছেন। বিশ্বকাপ জয়, কোপা আমেরিকা শিরোপা, চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় কিংবা রেকর্ড আটবার ব্যালন ডি’অর জয়—সাফল্যের সব শিখরেই পৌঁছেছেন তিনি। এবার সেই দীর্ঘ তালিকায় যোগ হলো স্পেনের রাজকন্যার দেওয়া বিশেষ সম্মাননা। স্পেনের রাজকন্যা লিওনরের হাত থেকে 'প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ক্রীড়া পুরস্কার' গ্রহণ করেছেন এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। এই পুরস্কার এককভাবে জয় করা প্রথম ফুটবলার হয়ে নতুন এক ইতিহাস গড়লেন মেসি।
গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) স্পেনের ওভিয়েদো শহরের ঐতিহাসিক তিয়াত্রো কাম্পোয়ামোরে এক জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানেই রাজকন্যা লিওনর মেসির হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন। অনুষ্ঠানে রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফেলিপে, রানি লেতিসিয়া এবং রাজকুমারী সোফিয়া। মেসির পাশে এই বিশেষ মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন তার স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো। মেসি যখন পুরস্কার গ্রহণের জন্য মঞ্চে উঠলেন, তখন উপস্থিত অতিথিদের তুমুল করতালিতে তাকে স্বাগত জানানো হয়।
স্পেনের অন্যতম এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের ৪৬ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে মেসিই প্রথম ফুটবলার যিনি এককভাবে ক্রীড়া বিভাগে এই সম্মাননা লাভ করলেন। এর আগে ২০০২ সালে বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল জাতীয় দল এবং ২০১২ সালে স্পেনের দুই তারকা ফুটবলার ইকার ক্যাসিয়াস ও জাভি হার্নান্দেজ যৌথভাবে এই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। এছাড়া ক্রীড়া বিভাগে প্রথম দক্ষিণ আমেরিকান হিসেবেও এই পুরস্কার জয়ের অনন্য রেকর্ড গড়লেন মেসি।
পুরস্কার প্রদানকালে রাজকন্যা লিওনর মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং ফুটবলের প্রতি তার অপরিসীম অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি কেবল মেসির অসাধারণ পারফরম্যান্সের কথা বলেননি, বরং ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলীয় সাফল্যকে গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতাকেও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
রাজকন্যা লিওনর বলেন, “মেসির দিকে এবং তার অতুলনীয় ক্যারিয়ারের দিকে তাকানোই যথার্থ। তিনি অসাধারণ বিষয়কেও নিয়মিত ঘটনায় পরিণত করেছেন। মুহূর্তের ভগ্নাংশে খেলা বুঝে সবচেয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ব্যক্তিগত অহংকারের চেয়ে দলীয় খেলাকেই সব সময় প্রাধান্য দিয়েছেন।”
বিশ্বজুড়ে ফুটবলের আবেদন এবং এর প্রভাব নিয়েও কথা বলেন স্পেনের রাজকন্যা। তার মতে, ফুটবলের একটি গোল যে ধরনের আবেগ তৈরি করতে পারে, খুব কম বিষয়ই মানুষকে সেভাবে এক করতে পারে। মেসির পুরো ক্যারিয়ার সেই আবেগ এবং অসাধারণ প্রতিভারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
গত জুনে প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ফাউন্ডেশন মেসিকে এবারের ক্রীড়া পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করার কথা ঘোষণা করে। নির্বাচকমণ্ডলীর মতে, ফুটবলে অসামান্য সাফল্যের পাশাপাশি মাঠের বাইরে মেসির মানবিক ভূমিকা এই স্বীকৃতির অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় 'লিও মেসি ফাউন্ডেশন'-এর কার্যক্রমকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছে।
পুরস্কার গ্রহণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আয়োজক কর্তৃপক্ষ এবং সমর্থকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মেসি।
তিনি লেখেন, “প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ক্রীড়া পুরস্কার গ্রহণ করা আমার জন্য সম্মানের। অন্য পুরস্কারপ্রাপ্ত সবাইকে অভিনন্দন। তাদের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে এবং এই দিনগুলো একসঙ্গে কাটিয়ে খুব ভালো লেগেছে।”
দীর্ঘদিন পর স্পেনে ফিরে আসার আনন্দও প্রকাশ করেন ইন্টার মায়ামির এই তারকা। মেসি আরও লেখেন, “এত বিশেষ একটি স্বীকৃতির জন্য প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ। মানুষের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি, তার জন্যও আমি কৃতজ্ঞ। অনেক দিন পর এখানে এলাম। সত্যিই সময়টা দারুণ উপভোগ করেছি।”
পুরস্কার নিতে ওভিয়েদোতে আসার পেছনে ব্যক্তিগত আবেগের কথা জানান মেসি। বৃহস্পতিবার সংবাদ সংস্থা ইএফইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার প্রয়াত বাবা হোর্হে মেসি এই সম্মাননা নিয়ে অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত ছিলেন। ব্যস্ত সূচির মধ্যেও স্পেনে গিয়ে এই পুরস্কারটি গ্রহণ করার জন্য তার বাবা তাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছিলেন।
মেসি বলেন, “আমার বাবা এই পুরস্কার নিয়ে খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন। এখানে এসে পুরস্কারটি গ্রহণ করার জন্য তিনি অনেকবার বলেছিলেন। আমার বিশ্বাস, তিনিও এখন এটি উপভোগ করছেন।”
পুরস্কার গ্রহণের আগের দিন বৃহস্পতিবার ওভিয়েদোতে হাজারো শিশু-কিশোরের সঙ্গে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন মেসি। সেখানেও তাকে ঘিরে ছিল ব্যাপক উন্মাদনা ও উচ্ছ্বাস। শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার গ্রহণের মধ্য দিয়ে তার সংক্ষিপ্ত স্পেন সফরের মূল পর্বের সমাপ্তি ঘটে।
এবারের আসরে মেসির পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সম্মানিত হয়েছেন। সংগীত ও শিল্পকলায় প্যাটি স্মিথ, সাহিত্যে জুলিয়ান বার্নস এবং যোগাযোগ ও মানবিকতার ক্ষেত্রে জাপানের বিখ্যাত অ্যানিমেশন প্রতিষ্ঠান স্টুডিও জিবলি এই সম্মাননা লাভ করেছে।
ফুটবল মাঠে একের পর এক রেকর্ড গড়ার পর এবার মাঠের বাইরেও অনন্য স্বীকৃতি পেলেন মেসি। বার্সেলোনার হয়ে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল সময় কাটিয়েছেন যে স্পেনে, সেই দেশেই ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে এক অনন্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জয় করলেন তিনি।