লিওনেল মেসিকে এক নজর দেখার জন্য ওভিয়েদোর রাস্তার দুই পাশে ভিড় জমিয়েছেন শত শত ভক্ত। তাঁদের এই ভালোবাসার উষ্ণ অভ্যর্থনা নিয়ে গতকাল পরিবারসহ স্পেনে ফিরেছেন এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। যুক্তরাষ্ট্রে মৌসুম চলাকালীন সময়েই একটি বিশেষ পুরস্কার গ্রহণের জন্য স্পেনে যাত্রা করেছেন মেসি। পুরস্কারটির নাম ‘প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড’। বাংলাদেশ সময় আজ রাতে এই সম্মাননা প্রদান করা হবে।

খেলোয়াড়ি জীবনে অনন্য অর্জন এবং পাশাপাশি নিজের দাতব্য ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ প্রিন্সেস আস্তুরিয়াস অব অ্যাওয়ার্ড ফর স্পোর্ট পাবেন মেসি। উল্লেখ্য, ১৯৮১ সাল থেকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তি বা সংস্থাকে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার দেওয়া হয়ে আসছে।

ওভিয়েদোর হোটেল দে লা রেকনকিস্তায় অবস্থানকালে স্প্যানিশ বার্তা সংস্থা ইএফইকে একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করেন মেসি। সেখানে এই পুরস্কারের গুরুত্ব এবং বার্সেলোনায় কাটানো তাঁর ক্যারিয়ার ও জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন ৩৯ বছর বয়সী ইন্টার মায়ামি ফরোয়ার্ড।

প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস পুরস্কারটির প্রতি মেসির এক গভীর ব্যক্তিগত টান রয়েছে। গত আগস্টে তাঁর বাবা হোর্হে মেসি মারা যাওয়ার আগে এই স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত রোমাঞ্চিত ছিলেন। ব্যস্ত মৌসুমের চাপ থাকা সত্ত্বেও ছেলেকে ওভিয়েদোয় যাওয়ার জন্য তাগিদ দিয়েছিলেন হোর্হে।

বাবার সেই স্মৃতি স্মরণ করে মেসি বলেন, ‘আমি খুব খুশি। আমার বাবা এই পুরস্কার নিয়ে দারুণ রোমাঞ্চিত ছিলেন। ম্যাচ থাকায় এখানে আসা কঠিন হবে, আমরা তা জানতাম। কিন্তু এই পুরস্কার নিতে আমি যেন এখানে আসি, সে জন্য তিনি খুব জোর করেছিলেন। পুরো ক্যারিয়ারে আমি যা করেছি, এটি তার চেয়ে বেশি কিছু। এই স্বীকৃতিতে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন, তাই আমি নিশ্চিত যে তিনিও এটি উপভোগ করছেন।’

বাবার সঙ্গে মেসির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আবেগের। দীর্ঘ অসুস্থতার পর গত ৮ আগস্ট ৬৮ বছর বয়সে পরলোক করেন তাঁর বাবা। বাবার সঙ্গে এই গভীর বন্ধন নিয়ে আটবার ব্যালন ডি’অরজয়ী এই কিংবদন্তি বলেন, ‘আমি তাঁর সঙ্গে সব সময় কথা বলতাম।’ মেসি আরও জানান, ম্যাচ এবং নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে বাবার সঙ্গে আলোচনা করা তাঁর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।

ঠিক যেমন একসময় অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল বার্সেলোনার জার্সি পরে মাঠে নামা। ২০০০ সালে কাতালান ক্লাবটির বয়সভিত্তিক দলে যোগ দেওয়ার পর দীর্ঘ ২১ বছর সেখানে কাটিয়ে স্পেন ছাড়েন মেসি। এই দীর্ঘ সময়ে বার্সার হয়ে এমন কিছু নেই যা তিনি জয় করেননি। সেই সোনালী দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে মেসি বলেন, ‘সবকিছু জেতার সৌভাগ্য হয়েছিল আমাদের এবং যেভাবে সেটা করেছি। খেলা, জয় ও গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলো উপভোগের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছি রোজকার অভিজ্ঞতা ও অনুশীলন। আমাদের সময়টা দারুণ কেটেছে।’

যে ক্লাবে তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন, সেই বার্সেলোনা মেসির জীবনে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্নের উত্তরে কিংবদন্তির মুখে শোনা গেল, ‘অল্প কথায় বলা কঠিন। আমার জীবনের ক্লাব।’ বার্সেলোনায় থাকাকালীন মেসির তিন সন্তানের জন্ম এবং জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তিনি এই শহরেই অতিবাহিত করেছেন। তাই আজও এই শহর ও ক্লাবের প্রতি মনে মনে ‘বিশেষ এক টান’ অনুভব করেন তিনি।

চলতি মাসেই আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ ম্যাচটি খেলেছেন মেসি। তবে ক্লাব ফুটবলে তিনি এখনো সক্রিয়। তবে তিনি কতদিন খেলা চালিয়ে যাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। অবসর নেওয়ার পর মানুষ তাঁকে কীভাবে মনে রাখবে, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি উত্তর দেন, ‘একজন গ্রেট অ্যাথলেট হিসেবে, যে সব সময় লক্ষ্য ও স্বপ্ন পূরণে চেষ্টা করেছে। কখনো আমি চাওয়া অনুযায়ী অর্জনে সফল হয়েছি, আবার কখনো হইনি। কিন্তু সামনে যা এসেছে, তার প্রতিটিতে জয়ী হতে আমি কখনো চেষ্টা থামাইনি।’

মেসি মনে করেন, সেরেনা উইলিয়ামস, রাফায়েল নাদাল এবং মাইকেল শুমাখারের মতো কিংবদন্তিরা অতীতে এই পুরস্কার জিতেছেন, তাই তাঁদের তালিকায় নিজের নাম যুক্ত করতে পারাটা তাঁর জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয়।

প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ফাউন্ডেশন এই পুরস্কারের আয়োজন করে থাকে। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্পেনের রাজা ও রানি। প্রতিবছর ওভিয়েদোর তেত্রো কাম্পামোয়র থিয়েটারে এই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় জোয়ান মিরোর নকশা করা একটি ভাস্কর্য, একটি সনদ, একটি প্রতীকী পদক এবং ৫০ হাজার ইউরো। স্পেনের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী এবং বর্তমান প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস লিওনর এই পুরস্কার প্রদান করেন। মোট আটটি ক্যাটাগরিতে এই সম্মাননা দেওয়া হয়।