ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি এবং এর জটিলতা নিয়ে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। ডেঙ্গুর গুরুতর পর্যায়ে রক্তনালির ভেতর থেকে তরল বা প্লাজমা আশপাশের টিস্যুতে বেরিয়ে আসার ঘটনা ঘটে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘প্লাজমা লিকেজ’। যদি প্লাজমা লিকেজের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তবে রক্তসঞ্চালন হ্রাস পায় এবং অত্যন্ত দ্রুত রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এই অবস্থায় সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়া গেলে রোগী শকে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

একবার শক হয়ে গেলে শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন—মস্তিষ্ক, কিডনি, লিভার এবং হৃদ্‌যন্ত্র পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ পায় না। এর ফলে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

সাধারণত ধারণা করা হয় জ্বর চলে গেলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন, কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে তা সঠিক নয়। ডেঙ্গুর ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ মূলত জ্বর কমার সময়ই শুরু হয়—সাধারণত অসুস্থতার তৃতীয় থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে। এই সময়ে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি হওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অস্থিরতা অনুভব করা, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অত্যধিক তৃষ্ণা কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া মারাত্মক বিপৎসংকেত হতে পারে।

ডেঙ্গু শনাক্তকরণের জন্য বহুল ব্যবহৃত এনএসওয়ান এন্টিজেন টেস্ট সাধারণত অসুস্থতার প্রথম সাত দিনে সবচেয়ে বেশি উপযোগী। তবে মনে রাখতে হবে, একটি নেগেটিভ এনএসওয়ান রিপোর্ট দেখে ডেঙ্গুর আশঙ্কাকে নিশ্চিতভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ পরীক্ষাটি ঠিক কখন করা হয়েছে, ব্যবহৃত কিটের মান কেমন, ভাইরাসের সেরোটাইপ কী এবং এটি রোগীর প্রথম সংক্রমণ নাকি একাধিকবার হওয়া ডেঙ্গু সংক্রমণ—এই বিষয়গুলোর ওপর পরীক্ষার ফলাফল নির্ভর করে।

তাই ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে এবং সন্দেহ হলে শুধুমাত্র একটি নেগেটিভ রিপোর্ট দেখে চিকিৎসা বা পর্যবেক্ষণ বন্ধ করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে সিবিসি, হিমাটোক্রিট ও অন্যান্য রক্ত পরীক্ষা এবং রোগীর ধারাবাহিক ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ডেঙ্গু ভাইরাসের মোট চারটি সেরোটাইপ রয়েছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর সাধারণত সেটির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়; তবে অন্যান্য সেরোটাইপের বিরুদ্ধে স্থায়ী সুরক্ষা তৈরি হয় না। ফলে ভিন্ন সেরোটাইপে সংক্রমিত হলে তীব্র ডেঙ্গুর ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে বাংলাদেশে চারটি সেরোটাইপই বিদ্যমান থাকায় আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পুনঃসংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুকে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা সঠিক পদ্ধতি নয়। প্লাটিলেট কমে যাওয়ার ফলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়লেও, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো শক। জ্বরের পর দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি, বিপৎসংকেত কিংবা শকের লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়াই জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এই গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শগুলো দিয়েছেন ডা. তারেক সালাহ্উদ্দিন, ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, বাংলাদেশ ক্যানসার অ্যান্ড প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টার, ধানমন্ডি, ঢাকা।