দিনের বেলা চিটচিটে গরম আর শরীরে ঘাম থাকলেও ভোরে হালকা কুয়াশার আনাগোনা এবং সন্ধ্যার পর শীত শীত অনুভূতি জানান দিচ্ছে যে হেমন্ত এসে গেছে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনের পাশাপাশি আমাদের শরীরও বিভিন্নভাবে সংকেত দেয়। আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনের ফলে বাতাসের আর্দ্রতা হ্রাস পায় এবং বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আবহাওয়ার এই নানা রকম পরিবর্তনের কারণে শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। হেমন্তের এই মৌসুমি রোগবালাই থেকে দূরে থাকতে শুরুতেই সাবধান হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আগে জেনে নিন এই সময়ে সাধারণত কী ধরনের অসুস্থতা বেশি দেখা যায়।
গরম ও ঠান্ডার এই মিশ্র আবহাওয়ার কারণে সর্দি-কাশি কিংবা ঠান্ডাজনিত জটিলতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ফ্লু-জাতীয় ভাইরাসের সংক্রমণ এই সময়ে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়। হঠাৎ করে শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, গা কাঁপিয়ে জ্বর, গলাব্যথা, খুসখসে কাশি এবং সর্দির কারণে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের জ্বরের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় চার-পাঁচ দিনের মাথায় সুস্থতা ফিরে এলেও কাশি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, যার সাথে থাকে শরীর দুর্বলতা ও অরুচি। এসব জ্বরের জন্য বিশেষ কোনো চিকিৎসা নেই; তবে জ্বর বা ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ এবং কাশি বা গলায় সংক্রমণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করতে হবে। ওষুধের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল ও পুষ্টিকর খাবার, গরম চা এবং আদা সেবন করলে শরীরে আরাম বোধ হয়।
শুষ্ক আবহাওয়ার পাশাপাশি বাতাসে ধুলাবালুর প্রকোপের কারণে এই সময়ে অ্যালার্জির আক্রমণ তুঙ্গে থাকে। বিশেষ করে যাদের ঠান্ডা ও ধুলাবালুতে অ্যালার্জি বা হাঁপানির সমস্যা রয়েছে, তাদের কষ্ট এই সময়ে আরও বাড়তে পারে।
নাক সুড়সুড় করে হঠাৎ হাঁচি-কাশি বা শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া এই সময়ে বেশ সাধারণ একটি বিষয়। এছাড়া হেমন্তের শুরুতে সাইনোসাইটিসের সমস্যাও প্রকট হতে পারে। যাঁদের টনসিলের সমস্যা আছে, তাঁরাও নতুন করে ভোগান্তির মুখে পড়তে পারেন। এমনকি ব্রংকাইটিস বা নিউমোনিয়ার মতো শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক রোগব্যাধি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
তাই সবাইকে এই সময়ে সতর্ক থাকতে হবে, বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই অ্যালার্জিজনিত সমস্যা বা হাঁপানি রয়েছে। বাইরে বের হলে মাস্ক পরা জরুরি। ঠান্ডা ও ধুলাবালু থেকে সাবধানে থাকা এবং ঘরদুয়ার ধুলাবালুমুক্ত রাখতে পারলে জটিলতা কমানো সম্ভব। আর যদি শ্বাসকষ্টের সাথে জ্বর বা কাশি বেশি হয়, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
হেমন্তের শুরুতে বাতাসের আর্দ্রতা কমে গিয়ে শুষ্কতা বৃদ্ধি পায়, যার ফলে আমাদের ত্বক হয়ে পড়ে শুষ্ক ও রুক্ষ। সেই সঙ্গে ঠোঁট ফেটে যাওয়ার সমস্যাও দেখা দেয়। শুষ্ক ত্বকে চুলকানি, অ্যালার্জি বা একজিমা-জাতীয় সমস্যার প্রকোপ বাড়তে পারে।
তাই এই সময়ে ত্বকের আলাদা যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। পর্যাপ্ত তরল খাবার খাওয়ার পাশাপাশি ত্বকে ভালো ময়েশ্চারাইজার, গ্লিসারিন ইত্যাদি ব্যবহার করলে ত্বকের শুষ্কতা অনেকটা রোধ করা সম্ভব।
শীতকাল মানেই বাত ব্যধির প্রাদুর্ভাব। হেমন্তে যেহেতু ঠান্ডার ভাব শুরু হয়, তাই বাতের ব্যথাসহ শরীরে বিভিন্ন ধরনের ব্যথাবেদনার আক্রমণ বাড়ে। অনেকের বাতের ব্যথা এই সময়ে একেবারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
গিঁটে গিঁটে ব্যথাবেদনায় অনেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। সেই সঙ্গে এই সময়ে পেশিতে টান লাগার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। তাই হেমন্তের শুরুতেই এই বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে নিয়ম করে গরম কাপড়, হাত ও পায়ের মোজা এবং গরম পানি ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে আগেই চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে হেমন্ত ও শীতের ব্যথাবেদনার আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকা যায়।
ডেঙ্গু এখন সারা বছরের রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই হেমন্তেও ডেঙ্গু থেমে নেই, বরং মহা পরাক্রমে বিরাজমান। তাই ডেঙ্গুর ব্যাপারেও বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। এখন জ্বর হলেই প্রাথমিক পর্যায়ে ডেঙ্গুর পরীক্ষা করে ফেলা ভালো।
কারণ, মাঝেমধ্যেই ডেঙ্গু বা অন্যান্য ভাইরাসজনিত জ্বরের মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হয় না। তবে ডেঙ্গু টেস্ট নেগেটিভ এলেই যে পুরো নিরাপদ, ব্যাপারটা তেমনও নয়। টেস্ট যা-ই হোক, এই সময়ের জ্বরে অবশ্যই খুব সতর্ক থাকতে হবে।
গরম পুরোপুরি চলে যায়নি, আবার শীত দরজায় টোকা দিচ্ছে। এই সময়ে প্রয়োজনে হালকা গরম পোশাক পরিধান, গরম পানি ব্যবহার, বাইরে গেলে মাস্ক পরা, পর্যাপ্ত তরল পান, উষ্ণ পানীয় বা স্যুপ, পুষ্টিকর খাবার বিশেষ করে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ, ত্বকের আলাদা যত্ন নেওয়া, ঘরদোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং দরকারমতো চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খাওয়া জরুরি। ব্যস, এটুকু মেনে চললেই হেমন্তের রোগবালাইকে অনেকটা দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব।
লেখক: অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।