স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সঠিক শারীরিক ভঙ্গি বজায় রাখার মতো অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করতে পারলে মেরুদণ্ডের প্রায় ৮০ শতাংশ সমস্যা দূর করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন নিউরোসার্জনরা। একই সঙ্গে তারা দেশে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও ওজন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মেরুদণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দক্ষ জনবল, আধুনিক অস্ত্রোপচার সরঞ্জাম ও উন্নত প্রশিক্ষণসুবিধা বাড়ানোর আহ্বান জানাই।’
বিশ্ব স্পাইন দিবস উপলক্ষে গত রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত একটি সমাবেশ ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো উঠে এসেছে। দিবসটি পালন উপলক্ষে সকালে নিউরোসার্জারি বিভাগের উদ্যোগে একটি র্যালির আয়োজন করা হয়। পরবর্তীতে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ের প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স গ্যালারিতে বৈজ্ঞানিক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান।
র্যালি পরবর্তী সংক্ষিপ্ত সমাবেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, ‘স্পাইন এমন একটা, এমন একটা সাবজেক্ট, এমন একটা এখানে এমন ধরনের ডিজিজ কন্ডিশনগুলো থাকে যেখানে আমরা যেটা জানি সেটা হলো যে, পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নাই যে তার মেরুদণ্ডের সমস্যা ছাড়া স্পাইন বা মেরুদণ্ড এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মেরুদণ্ডের সমস্যা ছাড়া জীবনযাপন করেন, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই মেরুদণ্ডের সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমরা যদি এসব বিষয়ে সচেতন হই এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করি, তাহলে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক ক্ষয়জনিত পরিবর্তন ও এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার ক্ষেত্রে ৮০–৯০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি সম্ভব হতে পারে, অনেক ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার বা অন্যান্য আক্রমণাত্মক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজন ছাড়াই।’
জাহিদ রায়হান বলেন, ‘মেরুদণ্ড সুস্থ ও সবল রাখতে আমাদের যা যা করা প্রয়োজন, তার অনেক কিছুই আমরা জানি না। অথচ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং শারীরিক পরিশ্রমের মতো বিষয়গুলো মেরুদণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’
বৈজ্ঞানিক আলোচনা সভায় ঢামেক নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আ. ফ. ম. মোমতাজ হক বলেন, ‘আমরা একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে চাই। আর একটি জাতিকে গড়ে তুলতে হলে সেই জাতির সুস্থ থাকা অপরিহার্য। দুর্বল ও ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে কোনো জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই জনগণকে স্বাস্থ্যশিক্ষায় শিক্ষিত করা, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সুস্থ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যশিক্ষার মাধ্যমেই আমরা একটি সুস্থ, সচেতন ও কর্মক্ষম জাতি গড়ে তুলতে পারি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে মেরুদণ্ডের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারসেবা দিয়ে আসছি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। এ জন্য দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, উন্নত প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিদ্যমান সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারব, যাতে সেগুলোর কার্যকর সমাধান করা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এন্ডোস্কোপিক মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার শুরু করতে গিয়ে আমাদের চিকিৎসকদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ ধরনের অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত সি-আর্ম যন্ত্র, উপযুক্ত অস্ত্রোপচার টেবিল এবং অন্যান্য আধুনিক সরঞ্জামের পর্যাপ্ত সুবিধা সব সময় পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অস্ত্রোপচারের সময় একসঙ্গে বিভিন্ন দিক থেকে এক্স-রে চিত্র পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।’
এই চিকিৎসক আরও জানান, ‘এ ছাড়া এন্ডোস্কোপিক মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একজন তরুণ চিকিৎসককে এ আধুনিক পদ্ধতিতে দক্ষতা অর্জনের জন্য অনেক সময় নিজের অর্থ ব্যয় করে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সুবিধা না থাকলে তার অর্জিত জ্ঞান যথাযথভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থায় এ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা তাই অত্যন্ত জরুরি। আমরা চাই, ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি যোগ্য নিউরোসার্জন এন্ডোস্কোপিক মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারসহ আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতিতে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। একইভাবে, এন্ডোভাসকুলার নিউরোসার্জারির মতো উন্নত চিকিৎসাপদ্ধতিতেও দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আমাদের লক্ষ্য শুধু আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি চালু করা নয়; বরং এমন একটি চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে দক্ষ চিকিৎসক ও উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে রোগীরা নিরাপদ, কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানের সেবা পাবেন।’
বৈজ্ঞানিক আলোচনায় মেরুদণ্ডের সমস্যা রোগীদের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে তা তুলে ধরেন নিউরো সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আশিক এহসান। তিনি বলেন, ‘মেরুদণ্ডের সমস্যা বা কোমরব্যথা একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসমস্যা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসছে। শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে মেরুদণ্ডের সমস্যা ও কোমরব্যথার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর ও মুখরোচক খাবার গ্রহণ, রাত জাগা এবং নগরজীবনের মানসিক চাপ মেরুদণ্ডের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
তিনি জানান, মেরুদণ্ড সুস্থ রাখতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চতা অনুযায়ী সঠিক ওজন বজায় রাখা জরুরি। দৈনন্দিন সাধারণ কাজের সময়ও মেরুদণ্ডে আঘাত বা ব্যথা হতে পারে। প্রচলিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় চারজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে কোমরব্যথায় আক্রান্ত হতে পারেন।
এই ধরনের সমস্যা প্রতিরোধে সঠিক শারীরিক ভঙ্গি এবং কর্মপরিবেশের নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি। বিশেষ করে কীভাবে দাঁড়াতে হবে, বসতে হবে, হাঁটতে হবে এবং ভারী জিনিস তুলতে হবে, সে বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক।
নিউরো সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. মো. ইমাম হোসেন খান তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘অস্ত্রোপচারকক্ষে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে কাজ করার ক্ষেত্রেও সঠিক শারীরিক ভঙ্গি বজায় রাখা জরুরি। এতে আঘাতের ঝুঁকি কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকা সম্ভব হয়। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে চিকৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে সরাসরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব। এতে বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে এবং আরও বেশি মানুষকে কার্যকর চিকিৎসাসেবা দেওয়া যাবে। এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।’
একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কানিজ ফাতেমা ইশরাত জাহান (রিফাত) বলেন, ‘আজীবন মেরুদণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখতে হলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সঠিক শারীরিক ভঙ্গি ও কর্মপদ্ধতি মেনে চলতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সঠিক শারীরিক ভঙ্গি বজায় রাখা জরুরি। এমনকি দাঁড়ানো বা বসার ক্ষেত্রেও মেরুদণ্ড সোজা রাখা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের অনেকেরই একটি বদভ্যাস রয়েছে, বসলেই অজান্তে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ি বা বাঁকা হয়ে বসি। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বসার অভ্যাস মেরুদণ্ডের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফল অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদে বোঝা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেরুদণ্ডের দুটি কশেরুকার মধ্যবর্তী আন্তঃকশেরুকা চাকতির (ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্ক) ওপর চাপ শারীরিক ভঙ্গি ও নড়াচড়ার ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে, অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে থাকার পর সামনের দিকে ঝুঁকে কোনো কিছু তুলতে গেলে এই চাকতির ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রায়ই ছোটখাটো জিনিস মেঝেতে পড়ে যায়। যেমন, কলম বা অন্য কোনো বস্তু তুলতে গিয়ে আমরা অনেক সময় চেয়ারে বসেই কোমর বাঁকিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ি। এভাবে ভুল ভঙ্গিতে ভার তোলার ফলে মেরুদণ্ডের ওপর চাপ বেড়ে যেতে পারে এবং আন্তঃকশেরুকা চাকতিতে আঘাত লাগার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর পরিণতিতে দীর্ঘদিন কোমরব্যথায় ভুগতে হতে পারে।’
করণীয় সম্পর্কে তিনি পরামর্শ দেন, ‘কোনো কিছু তোলার সময় কোমর বাঁকিয়ে বা কুঁজো হয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়া এড়িয়ে চলতে হবে। সম্ভব হলে উঠে দাঁড়িয়ে, হাঁটু ভাঁজ করে এবং পিঠ যথাসম্ভব সোজা রেখে বস্তুটি তুলতে হবে। বস্তুটি তোলার সময় সেটি শরীরের কাছাকাছি রাখতে হবে এবং কোমরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এমন নড়াচড়া পরিহার করতে হবে।’