দারিদ্র্যের নির্মম আঘাত, চরাঞ্চলের প্রতিকূল পরিবেশ কিংবা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—কোনো কিছুই দমাতে পারেনি ইয়াছিনকে। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং সাহসিকতার ওপর ভর করে সাফল্যের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন লক্ষ্মীপুরের চরাঞ্চলের এই অকুতোভয় তরুণ।
লক্ষ্মীপুরের চর রমণী মোহন এলাকার ‘মেঘনাপাড় ধীবর আলোর পাঠশালার’ প্রাক্তন শিক্ষার্থী মো. ইয়াছিন প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, স্বপ্নের ডানায় ভর করে সততার সঙ্গে লড়াই করলে প্রতিকূলতার পাহাড়ও ডিঙানো সম্ভব।
পাঁচ ভাই ও তিন বোনের একটি বড় পরিবারে ইয়াছিনের জন্ম। তার বাবা মো. জব্বার রাঁড়ী পেশায় ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক। একসময় রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পরিবারের অন্ন জোগাতেন তিনি। তবে বয়সের ভার এবং নানা শারীরিক অসুস্থতার কারণে বর্তমানে তিনি শয্যাশায়ী। মা কামু বেগম শত অভাবের মাঝেও পরম মমতায় সন্তানদের আগলে রেখেছেন। বাবার অক্ষমতার কারণে যখন পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল, ঠিক তখনই পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তানদের একজন হিসেবে ইয়াছিন নিজের কাঁধে তুলে নেন সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব।
শিক্ষা অর্জনের পথটি ইয়াছিনের জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। চরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে গড়ে ওঠা ‘মেঘনাপাড় ধীবর আলোর পাঠশালা’ থেকেই শুরু হয় তার জীবনের মোড় ঘোরা। পাঠশালার শিক্ষকদের নিবিড় পরিচর্যায় তার শিক্ষার মজবুত ভিত্তি গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে শত বাধা উপেক্ষা করে তিনি রায়পুর সরকারি কলেজে ভর্তি হন। চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে ২০২৫ সালে রায়পুর সরকারি কলেজ থেকে সফলতার সঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।
এইচএসসি পাসের পর পরিবারের তীব্র আর্থিক সংকট তাকে থমকে যেতে বাধ্য করে। তবে বসে থেকে সময় নষ্ট করার বিলাসিতা ইয়াছিনের ছিল না। বৃদ্ধ অসুস্থ বাবা এবং বড় পরিবারের বেঁচে থাকার রসদ জোগাতে তিনি চলে আসেন গাজীপুরে। বর্তমানে সেখানে একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কর্মরত আছেন ইয়াছিন।
দিনরাত কায়িক পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ তিনি চরের বাড়িতে পাঠাচ্ছেন। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির এই চাকরিটিই এখন তার পুরো পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। ইয়াছিনের এই উপার্জনেই হাসি ফুটছে বৃদ্ধ বাবা-মা এবং ছোট ভাই-বোনদের মুখে।
ইয়াছিনের এই অদম্য জীবনসংগ্রাম ও সফলতা দেখে আনন্দিত ও গর্বিত মেঘনাপাড় ধীবর আলোর পাঠশালার শিক্ষক এবং স্থানীয় এলাকাবাসী। পাঠশালার এক শিক্ষক বলেন, ‘ইয়াছিনের এই জয় আমাদের পথচলাকে সার্থক করেছে। সে প্রমাণ করেছে, সততা, মেধা আর প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিকেও জয় করা সম্ভব।’