স্বামীর অকাল প্রয়াণের পর তিন সন্তানের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে চরম প্রতিকূলতার মুখে পড়েছিলেন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গান্ধিয়াশুর গ্রামের বাসিন্দা অঞ্জলি মণ্ডল। জীবনযুদ্ধের এই কঠিন সময়ে সংসারের হাল ধরতে তিনি কখনো অন্যের জমিতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তবে দারিদ্র্যের কাছে আত্মসমর্পণ না করে, নিজের অর্জিত প্রতিমা তৈরির দক্ষতাকে তিনি জীবিকার প্রধান উৎস হিসেবে গ্রহণ করেন। বর্তমানে ছেলে সম্রাট মণ্ডলের সহযোগিতায় দুর্গাসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরি করছেন অঞ্জলি। এই কারুশিল্পের আয় দিয়েই তার সংসার পরিচালিত হচ্ছে এবং এর মাধ্যমেই তিনি সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছেন।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গান্ধিয়াশুর গ্রামে অঞ্জলির দিনের অধিকাংশ সময় কাটে প্রতিমা তৈরির কাজে। মাটির প্রাথমিক কাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে প্রলেপ দেওয়া এবং প্রতিমার প্রতিটি অংশ নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার কারিগর তিনি। এই সৃজনশীল কাজে তাকে সাহায্য করে তার ছেলে সম্রাট। মা ও ছেলের সম্মিলিত পরিশ্রমে এক একটি শৈল্পিক প্রতিমা রূপ পায়। তবে এই কর্মব্যস্ততার গভীরে লুকিয়ে আছে অভাবের সাথে লড়াই করে টিকে থাকার এক করুণ ও অনুপ্রেরণামূলক গল্প।
২০২১ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন অঞ্জলি। সংসারের যাবতীয় ব্যয়ভার এবং সন্তানদের ভরণপোষণের গুরুদায়িত্ব একাই বহন করতে হয় তাকে। জীবনধারণের তাগিদে তিনি অন্যের জমিতে কৃষি কাজ করে উপার্জন করার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে স্বামীর কাছ থেকে শেখা প্রতিমা তৈরির কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নতুন করে পথচলা শুরু করেন। সময়ের সাথে সাথে এই পেশাই হয়ে ওঠে তার পরিবারের প্রধান অর্থনৈতিক অবলম্বন।
চলতি বছর ছেলে সম্রাটের সহায়তায় মোট ছয়টি প্রতিমা তৈরি করেছেন অঞ্জলি। প্রতিমা বিক্রির অর্থ দিয়ে যেমন সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেটানো হচ্ছে, তেমনি সন্তানদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তিনি। সীমিত আয়ের সীমাবদ্ধতা থাকলেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার প্রত্যাশা অত্যন্ত প্রবল। নিজের কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে চান এই নারী কারিগর।
অঞ্জলির এই জীবনসংগ্রাম স্থানীয় বাসিন্দাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জীবনসঙ্গীকে হারানোর শোক কাটিয়ে নিজের দক্ষতাকে পুঁজি করে যেভাবে তিনি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, তা অনেকের কাছেই প্রশংসনীয়।
স্থানীয়দের মতে, তার মতো সংগ্রামী নারীদের যদি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া যায়, তবে তারা নিজেদের কাজের পরিধি বাড়িয়ে আরও বেশি স্বাবলম্বী হতে পারবেন।
প্রতিমা তৈরির মাধ্যমে সংসারের হাল ধরলেও অঞ্জলির সামনে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। একদিকে সংসারের ব্যয়ভার বহন, অন্যদিকে সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির কাজ আরও বাড়ানো—সবকিছুই তাকে একাই সামলাতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও দমে যাননি অঞ্জলি। নিজের কঠোর শ্রম ও দক্ষতাকে সম্বল করে তিন সন্তানকে নিয়ে এক সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়েই অবিচলভাবে এগিয়ে চলেছেন তিনি।