কক্সবাজারের উখিয়ায় ইনানীর মেরিন ড্রাইভ সড়ক সংলগ্ন টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন পুলিশ এবং গঠিত তদন্ত কমিটি।

ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগা এবং পরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।”

এই বিষয়ে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, গ্রেপ্তার করা সহকারী ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানের তথ্যানুযায়ী, নিচতলায় থাকা একটি ফ্রিজে প্রথমে শর্টসার্কিট ঘটে। সেখান থেকে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ার পর রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে। এছাড়া গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ মজুত থাকার পাশাপাশি তীব্র বাতাস এবং রিসোর্টের কাঠের অবকাঠামোর কারণে আগুন অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সেখানে ঠিক কী ধরনের রাসায়নিক পদার্থ রাখা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ বলেন, “আগুনের সূত্রপাত নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।”

প্রাথমিক অনুসন্ধানের তথ্যানুসারে, নিচতলার একটি ফ্রিজে শর্টসার্কিটের পর রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, রিসোর্টের গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণটি এখনও চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য, গত ১৭ অক্টোবর শনিবার সকালে উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকত-সংলগ্ন মেরিন ড্রাইভের পাশে অবস্থিত তিনতলা রিসোর্টটিতে এই ভয়াবহ আগুন লাগে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় ১০ জন পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই রিসোর্টটির দোতলা ও তিনতলার আটটি কক্ষে পর্যটকরা অবস্থান করছিলেন। নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ এবং কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা।

রিসোর্টের পাশে চা-কফির দোকান চালানো গিয়াস উদ্দিন জানান, ঘটনার সকালে তিনি একটি বিকট শব্দ শুনে বাইরে আসেন এবং রিসোর্টে আগুন জ্বলতে দেখেন। সে সময় সেখানে ব্যাপক ছোটাছুটি চলছিল। আগুনের তাপে তার দোকানের একটি ফ্রিজ এবং কাঠের কিছু অংশ পুড়ে যায়। জালিয়াপালং ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপি কমান্ডার মোহাম্মদ আজিজও বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন, যদিও শব্দটির সঠিক উৎস তারা নিশ্চিত করতে পারেননি।

প্রায় ২০ শতক জমির ওপর নির্মিত এই রিসোর্টের কক্ষের মেঝে, দেয়াল এবং সিঁড়ির বড় অংশই ছিল কাঠের তৈরি। এছাড়া সড়কের পাশে গাছের খুঁটির ওপর রেস্তোরাঁর বর্ধিত অংশ নির্মাণ করা হয়েছিল, যা আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।

তদন্তে জানা গেছে, টুপটুপ রিসোর্টের ব্যবসাটি কেবল জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের দেওয়া ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছিল। গত ২২ জুলাই রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়ার নামে এই লাইসেন্সটি ইস্যু করা হয়, যেখানে তার ঠিকানা চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মীরপাড়া হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। লাইসেন্সটির মেয়াদ চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। লাইসেন্স ফি ৫০০ টাকা, মূল্য সংযোজন কর ৭৫ টাকা ও বাণিজ্যিক কর ১ হাজার ৪২৫ টাকাসহ মোট ২ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল।

জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম ছৈয়দ আলম বলেন, “ইউনিয়ন এলাকায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ফি নিয়ে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়। টুপটুপ রিসোর্টের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে।” তবে অগ্নিকাণ্ডের পর সামনে এসেছে যে, প্রতিষ্ঠানটির ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না।

এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টের মালিক এবং মামলার প্রধান আসামি তানভীর সুলতান মিয়া পলাতক রয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তিনি বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থান করছেন। রিসোর্টের আরেক মালিক নেওয়াজ মোরশেদসহ অন্যান্যরাও আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এই ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হলেও রিমান্ড শুনানি এখনও অনুষ্ঠিত হয়নি।