‘আমি কাঁদছিলাম। সে আমাকে বলেছিল, “কেঁদো না। এক-দেড় ঘণ্টা পর বাসায় গিয়ে তোমাকে ফোন দেব।” কিন্তু আমার খুব ভয় লাগছিল। সে যাওয়ার আগে থেকেই কেমন যেন লাগছিল, আগে কখনো এমন ভয় লাগেনি। সৌদি আরবে যুদ্ধ হচ্ছে, এই ভেবেই আমি তাঁকে যেতে দিতে চাইনি। কিন্তু ও জোর করেই চলে গেল।’
কান্নাভেজা কণ্ঠে এসব কথা বলছিলেন কহিনুর আক্তার কাকলী। সৌদি আরবে যাওয়ার আগে স্বামী মো. শাহেদ আহম্মেদকে নিয়ে তাঁর মনে যে অজানা আশঙ্কার জন্ম হয়েছিল, তা এখন এক নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ হামলায় প্রাণ হারান শাহেদ। আজ শুক্রবার সকালে তাঁর মরদেহ ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। স্বামীর মরদেহ গ্রহণ করতে বিমানবন্দরে আসা কহিনুর সাংবাদিকদের কাছে তাঁদের শেষ কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করেন।
কহিনুর জানান, এবার প্রায় এক মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন শাহেদ। এই ছুটিতে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া বা বাইরে ঘুরতে যাওয়ার চেয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করতেন। পরিবারের সঙ্গে কাটানো সেই আনন্দময় দিনগুলোই এখন তাঁর স্মৃতিতে বারবার ভেসে উঠছে।
‘যেতে দিতে চাইনি, কিন্তু চলে গেল’
সৌদি আরবে ফেরার আগে থেকেই স্বামীর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন কহিনুর। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে তিনি শাহেদকে যেতে দিতে চাননি। তবে জীবিকার তাগিদে শাহেদকে ফিরতেই হয়। যাওয়ার সময় স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে তিনি কথা দিয়েছিলেন যে, বাসায় পৌঁছে ফোন করবেন। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত ফোন আর আসেনি।
শাহেদ সৌদি আরবের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জেদ্দা প্রকল্পে প্লাম্বার হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং তাঁর বৈধ কাজের অনুমতিপত্র বা ইকামা ছিল। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ছুটি কাটিয়ে দেশে অবস্থান করছিলেন তিনি। সেখান থেকে রিয়াদ হয়ে জেদ্দায় কর্মস্থলে ফেরার পথে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে আরও দুবার সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শাহেদ, তবে কাজের সুযোগ না পাওয়ায় তাঁকে দেশে ফিরতে হয়েছিল। প্রায় দুই বছর আগে তৃতীয়বার সৌদি আরবে গিয়ে তিনি প্রথমে শ্বশুরের কাছে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে শ্বশুরের সহায়তায় একটি কোম্পানিতে চালক হিসেবে নিয়োগ পান এবং লাইসেন্স জমা দিয়ে কাজে যোগ দেন। কর্মস্থল পরিবর্তনের কারণে তিনি জেদ্দায় চলে যান, আর তাঁর শ্বশুর চলে যান দাম্মামে।
বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের বাসিন্দা শাহেদ গত ৭ সেপ্টেম্বর ছুটিতে দেশে আসেন। এক মাস তিন দিন পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে তিনি পুনরায় সৌদি আরবে ফিরে যান। এরপর ১০ অক্টোবর হুতিদের চালানো হামলায় তিনি প্রাণ হারান।
পরিবারের জন্য গড়া স্বপ্ন এখন ভেঙে গেছে
এবার সৌদি আরবে ফেরার সময় শাহেদের মনে অনেক আশা ছিল। কহিনুরের ভাষ্যমতে, এক বছর ধরে কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর স্বামীর মনে নতুন করে স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন আরও ভালোভাবে কাজ করে পরিবারের জন্য কিছু করতে এবং সংসারের হাল ধরতে। কিন্তু আকস্মিক এই মৃত্যুতে সেই সব প্রত্যাশা এখন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
শাহেদের মরদেহ দেশে পৌঁছালে তা গ্রহণ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার পর সরকারের পক্ষ থেকে শোকসন্তপ্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তার একটি চেক প্রদান করা হয়। প্রতিমন্ত্রী ভবিষ্যতে এই পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।
দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
শাহেদ ও কহিনুরের সংসারে দুই ছেলে—১০ বছর বয়সী কাউসার এবং পাঁচ বছর বয়সী জিহাদ। বাবার মরদেহ নিতে স্বজনদের সঙ্গে বিমানবন্দরে এসেছিল এই দুই শিশুও।
২৬ বছর বয়সী কহিনুর জানান, মাত্র ১৩ বছর বয়সে শাহেদের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পারস্পরিক পছন্দ ও ভালোবাসার সম্পর্ক থেকেই তাঁদের সংসার জীবনের শুরু। এত অল্প বয়সে জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে এখন দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে জীবন অতিবাহিত করবেন, সেই দুশ্চিন্তায় তিনি দিশেহারা।
কহিনুর বলেন, ‘আমার দুটি সন্তান। ওদের দায়িত্ব নেওয়ার মতো আর কেউ নেই। আমি চাই, আমার সন্তানদের নিয়ে যেন সারাটা জীবন বেঁচে থাকতে পারি। আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী যেন আমার পাশে দাঁড়ান।’
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১১ বাংলাদেশি
কর্মসংস্থানের জন্য বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। এর মধ্যে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি মানুষ কাজ করেন। সম্প্রতি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিরা সৌদি আরবে কয়েক দফা হামলা চালিয়েছে, যাতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে নিহত ১১ জন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। শাহেদ ছিলেন সেই তালিকায় ১১তম ব্যক্তি।
গত এক মাসে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মোট তিন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন শাহেদ, যাঁর মরদেহ আজ দেশে এসেছে। বাকিদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।