পর্তুগাল জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রথমে শাস্তি মেনে নেওয়ার কথা বললেও, পরবর্তীতে তা কমানোর জন্য নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সাফল্যের কথা তুলে ধরেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। যদিও শুরুতে তিনি দাবি করেছিলেন যে নিজের জন্য কোনো বিশেষ ছাড় চান না, তবে শৃঙ্খলাসংক্রান্ত তদন্তের নথিতে উঠে এসেছে ভিন্ন এক চিত্র। পর্তুগিজ এই মহাতারকা তার ব্যক্তিগত পুরস্কার এবং জাতীয় দলের প্রতি অবদানের কথা উল্লেখ করে শাস্তির মেয়াদ কমানোর অনুরোধ জানান। ফুটবল ফেডারেশন তার সেই যুক্তিগুলো বিবেচনা করেই শাস্তির মাত্রা হ্রাস করেছে।

গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের (এফপিএফ) শৃঙ্খলা পরিষদ রোনালদোকে ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা এবং ২৫৫ ইউরো জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই সিদ্ধান্তের বিস্তারিত নথিতে দেখা গেছে, ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড আরও কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে পারতেন। ফেডারেশনের নিয়ম অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার অপরাধে এক থেকে ছয় মাস পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্ত চলাকালীন রোনালদো শাস্তি কমানোর পক্ষে তিনটি প্রধান যুক্তি উপস্থাপন করেন। প্রথমত, চলতি মৌসুমসহ আগের তিনটি মৌসুমে তার শৃঙ্খলাসংক্রান্ত রেকর্ড ছিল সন্তোষজনক। দ্বিতীয়ত, ফুটবলে তার দীর্ঘদিনের অবদান এবং ক্রীড়াক্ষেত্রে অর্জিত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তৃতীয়ত, তদন্ত প্রক্রিয়ায় তার পূর্ণ সহযোগিতা এবং ঘটনার সত্যতা প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা।

নিজের অবদানের প্রমাণ হিসেবে রোনালদো ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে জেতা বিভিন্ন শিরোপার কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে ছিল ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং দুটি উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপা জয়। ব্যক্তিগত অর্জনের কথা বলতে গিয়ে তিনি পাঁচটি ব্যালন ডি’অর ও চারটি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জয়ের তথ্যের কথা জানান। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার গোল ও ম্যাচ খেলার রেকর্ড এবং পর্তুগিজ রাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত সম্মাননার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

শৃঙ্খলা পরিষদ রোনালদোর এসব যুক্তির কিছু অংশ গ্রহণ করে। তার ফুটবল ক্যারিয়ারের অবদান ও অর্জন বিবেচনা করে প্রথমে সম্ভাব্য শাস্তির সীমা অর্ধেক করা হয়। এরপর তিনি নিজের দায় নিঃশর্তভাবে স্বীকার করায় সেই সীমা আরও কমিয়ে আনা হয়। এই দুই ধাপের প্রক্রিয়ার পর নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য মেয়াদ ৮ থেকে ৪৫ দিন নির্ধারিত হয়। সবশেষে সবকিছু বিবেচনা করে ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা ও ২৫৫ ইউরো জরিমানার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে এই পুরো বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে রোনালদোর পূর্ববর্তী অবস্থানের কারণে। গত ৬ অক্টোবর এক দীর্ঘ বিবৃতিতে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, নিজের আচরণের জন্য তিনি শাস্তি মেনে নিতে প্রস্তুত।

সেই বিবৃতিতে রোনালদো বলেছিলেন, ‘আমার এই কাজের মূল্যায়ন করে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের শাস্তি দেওয়া উচিত। আমি মনে করি, শাস্তির ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। আমি সাধারণ কোনো খেলোয়াড় নই, দলের অধিনায়ক। সেটি বরং আমার দায় আরও বাড়িয়ে দেয়।’

প্রকাশ্যে এমন কঠোর অবস্থান নেওয়ার পর তদন্তের সময় নিজের অর্জন ও রেকর্ড তুলে ধরে শাস্তি কমানোর চেষ্টা করাতেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয় সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে। উয়েফা নেশনস লিগে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদো বদলি বেঞ্চে ছিলেন। মাঠে নামার প্রস্তুতি নিলেও কোচ হোর্হে জেসুস তাকে খেলাননি। এরপর ডেনমার্ক ম্যাচের আগেও তাকে শুরুর একাদশে না রাখার সিদ্ধান্ত জানান কোচ। এতে অসন্তুষ্ট হয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান রোনালদো।

রোনালদোর দাবি, কোচ জেসুস তার খেলার সময় নিয়ে আগে যে পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, তা অনুসরণ করেননি। তবে কোচ জেসুস কোনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তদন্তের নথি অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর কোপেনহেগেনের পার্কেন স্টেডিয়ামে নির্ধারিত অনুশীলন শুরুর আগেই ক্যাম্প ছেড়ে যান রোনালদো। যাওয়ার আগে ফেডারেশনের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ জানাননি তিনি। পরে গাড়িতে করে বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে ফেডারেশন সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনসাকে ফোন করে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান। ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত জাতীয় দলের অনুশীলন, ম্যাচ, খাবার ও যাতায়াতসহ ৩০টির বেশি কার্যক্রমে অনুপস্থিত ছিলেন পর্তুগিজ অধিনায়ক।

তবে এই নিষেধাজ্ঞার কারণে আপাতত কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ মিস করতে হচ্ছে না রোনালদোকে। তার সাময়িক নিষেধাজ্ঞার সময়টুকু চূড়ান্ত শাস্তির হিসাবে ধরা হয়েছে। ফলে অক্টোবরের শেষ দিকেই ৩০ দিনের এই মেয়াদের সমাপ্তি ঘটবে। আগামী ১৪ নভেম্বর ডেনমার্ক এবং ১৭ নভেম্বর ওয়েলসের বিপক্ষে পর্তুগালের ম্যাচ রয়েছে। ফলে কোচ জেসুস চাইলে ওই দুই ম্যাচের দলে আবারও জায়গা পেতে পারেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা।