২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর কবি শামসুর রাহমানের ৯৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হবে। এরপর ২০২৯ সালে তাঁর জন্মশতবর্ষ পূর্ণ হবে। কবির মৃত্যুর প্রায় দুই দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর জন্মবার্ষিকী নিয়ে আলোচনা করা কেবল একজন প্রয়াত ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি আমাদের বর্তমান সময়কে বোঝার একটি সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস হওয়া উচিত। একই সঙ্গে এটি ভেবে দেখার সময় এসেছে যে, কবির শততম জন্মবার্ষিকীর জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত। এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অন্তত তিনটি মৌলিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন: সাহিত্যের যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রকাশ, চর্চা ও প্রসার এবং স্মৃতি রক্ষা। শামসুর রাহমানের মতো উচ্চমানের একজন কবির ক্ষেত্রে এর চেয়ে কম কিছু প্রত্যাশিত হওয়া উচিত নয়।
সাহিত্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে কবির প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত সকল কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং ব্যক্তিগত চিঠি সংগ্রহ করে একটি নির্ভরযোগ্য ‘রচনাবলি’ প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি। এই কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন, কারণ বর্তমান সময়ে কবির পরিবার-পরিজনের সহায়তা পাওয়া সহজ হবে। সংরক্ষণের অভাবে অতীতে অনেক মাস্টারপিস কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে নতুন প্রজন্মের পাঠকরা খুব সহজে তাঁর সাহিত্যের সান্নিধ্য পায়। এর পাশাপাশি কবির শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো বিভিন্ন ভাষায়, বিশেষ করে ইংরেজিতে অনুবাদ করা প্রয়োজন। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশ্বের প্রথিতযশা কবিদের সাথে শামসুর রাহমানের তুলনামূলক অধ্যয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
দ্বিতীয়ত, চর্চা ও প্রসারের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর কবিতা নিয়ে আবৃত্তি অনুষ্ঠান, সেমিনার এবং সাহিত্য আড্ডার আয়োজন করা যেতে পারে। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ চাইলে দীর্ঘমেয়াদি ‘কবি শামসুর রাহমান ফেলোশিপ’ চালু করতে পারে, যার আওতায় নিয়মিত সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের আয়োজন হবে। এর ফলে কবির সাহিত্যকর্মের ওপর গবেষণার একটি সুশৃঙ্খল বন্দোবস্ত তৈরি হবে এবং তাঁর সৃষ্টির নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হবে।
তৃতীয় পদক্ষেপটি হলো স্মৃতিরক্ষা কেন্দ্র স্থাপন। এমন একটি সংগ্রহশালা প্রয়োজন যেখানে কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র, খাতা, কলম এবং দুর্লভ ছবি সংরক্ষিত থাকবে। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে নরসিংদীর রায়পুরায় পাড়াতলী কলিম উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ে ‘কবি শামসুর রাহমান স্মৃতি গ্রন্থাগার’ নির্মিত হলেও তা কখনোই আলোর মুখ দেখেনি।
তবে এই বিশাল আয়োজন করা সহজ কাজ নয়। শামসুর রাহমান ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান কবি। আর প্রতিভাবানরা সাধারণত প্রচলিত ছাঁচে নিজেদের মানিয়ে নেন না; সমাজের সেলাই করা কাপড়ের মধ্যে নিজেদের ঢুকিয়ে দেন না। ফলে প্রতিভাবান কবিদের যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে, যা জীবদ্দশাতে তো বটেই, মৃত্যুর পরেও চলমান থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে মহাকবি জন মিল্টনের কথা বলা যায়। সমসাময়িক রাজনৈতিক বৈরিতার সম্মুখীন হওয়ার পর সাহিত্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বিশেষ করে কুৎসা তাঁকে দীর্ঘকাল পর্দার আড়ালে রেখেছিল। এমনকি টি এস এলিয়টও দীর্ঘ সময় মিল্টন-বিরোধী সমালোচনায় নিয়োজিত ছিলেন, যদিও পরবর্তীতে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। একইভাবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর প্রথম জীবনে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্যের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। অথচ সেই মিল্টনই ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি এবং মধুসূদনই বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে স্বীকৃত।
শামসুর রাহমানের কবিতার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে দেখা যায়, জাতীয়তাবাদী সমালোচনা সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছে, যা হয়তো তৎকালীন সময়ের দাবি ছিল। আবার পুরাণভিত্তিক সমালোচনার ক্ষেত্রেও জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাব ফেলেছে। এমন ধারা চলতে থাকলে পাঠক ও সমালোচকরা কেবল মুষ্টিমেয় কিছু কবিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেন। তাই এখন সময় এসেছে শামসুর রাহমানের কবিতাকে বিভিন্ন সমালোচনার লেন্স দিয়ে দেখার। এই লেন্সগুলো খুব নতুন নয়, তবে শামসুর রাহমানের ওপর তেমনভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। খুব কম বাঙালি কবি-সাহিত্যিকের কপালেই এমন সুযোগ জুটেছে। যেমন— উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনা, মার্ক্সবাদী সমালোচনা, আধুনিকতাবাদী ও অস্তিত্ববাদী সমালোচনা, আর্কিটাইপাল সমালোচনা, আন্তপাঠিক সমালোচনা বা ইন্টারটেক্সচুয়াল সমালোচনা ইত্যাদি।
জাতীয়তাবাদী সমালোচনা তাঁর কবিতায় বাঙালি জাতীয় পরিচয়, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনাকে বুঝতে সাহায্য করেছে। আর পুরাণভিত্তিক সমালোচনার মাধ্যমে তাঁর কবিতায় পৌরাণিক চরিত্র, প্রতীক ও আখ্যানের পুনর্ব্যবহার এবং সেগুলোর নতুন অর্থ নির্মাণ বিশ্লেষণও করা হয়েছে খানিকটা; যদিও এই দুই ক্ষেত্রেই আরও বিশদভাবে কাজ করার সুযোগ আছে।
অন্যদিকে, উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনা সাংস্কৃতিক আধিপত্য, রাজনৈতিক দমন ও প্রতিরোধের দিকগুলো উন্মোচন করে, যা শামসুর রাহমানের কবিতায় অন্বেষণের বিস্তর সুযোগ রয়েছে। মার্ক্সবাদী সমালোচনা শ্রেণিবৈষম্য, শোষণ, ক্ষমতা ও সামাজিক অন্যায়ের বিশ্লেষণে কার্যকর হতে পারে। আর নগরজীবন, নিঃসঙ্গতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও অস্তিত্বের সংকট অনুধাবনের জন্য আধুনিকতাবাদী ও অস্তিত্ববাদী সমালোচনার সাহায্যে শামসুর রাহমান হয়তো বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। বর্তমানে পরিবেশগত সমালোচনা বা ইকোক্রিটিসিজম এবং উত্তর-মানবতাবাদ বা পোস্টহিউম্যানিজম খুব আলোচিত হচ্ছে; এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলো প্রয়োগ করার সময়ও এখন এসেছে।
শামসুর রাহমানেরও প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে, তবে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত রাজনৈতিক বাইনারির অংশ, যেখানে কাব্য ও শিল্প অনুপস্থিত। সেখানে উপস্থিত রয়েছে আদর্শগত ও রাজনৈতিক পার্থক্য। রাজনৈতিক ও আদর্শিক মেরুকরণের ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তি মূল্যায়ন করা হয়েছে, ফলে তাঁর কবিতার নান্দনিকতা, আধুনিকতা বা শব্দের কারিগরি নিয়ে আলোচনা তেমন হয়নি। তবে এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন হুমায়ুন আজাদ, যিনি ১৯৮৩ সালে ‘শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা’ নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা গ্রন্থ রচনা করেন। পরবর্তীতে ২০১০ সালে গাজী আজিজুর রহমান ‘কবিদের কবি: জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান, আবুল হাসান’ বইটিতে ছোট পরিসরে ভালো কাজ করেছেন। এই দুটি বই ছাড়া তাঁর সাহিত্যকর্মের ওপর তেমন কোনো সিরিয়াস কাজ হয়নি বলে মনে হয়। যদিও বিভিন্ন পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন ও সাময়িকীতে তাঁর নিয়ে অসংখ্য লেখা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যা মন্দ প্রচেষ্টা নয়। তবে এখন সময় এসেছে ভিন্ন আঙ্গিকে কাজ করার।
পরিশেষে, শামসুর রাহমানের ৯৭তম জন্মবার্ষিকী যতটা না কবির নিজের, তার চেয়েও অনেক বেশি পাঠক ও সমালোচকের। আর সময় যত যাবে, এই দায়ের বোঝা ততই বাড়বে।