২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর কবি জীবনানন্দ দাশের ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকীর স্মৃতিবিজড়িত সময়ে তাঁর গদ্যভাষার বিশেষত্ব নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। মুক্তকণ্ঠের সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত সেই লেখাটি দীর্ঘকাল কেবল ছাপা কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল, যা এখন অনলাইন পাঠকদের জন্য পুনরায় উপস্থাপন করা হলো।
কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) তাঁর কাব্যভাষার এক অনন্য ও স্বতন্ত্র জগৎ তৈরি করেছিলেন—এই বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে আজ আর কারও দ্বিমত নেই। তবে তাঁর গদ্যরীতির দিকে নজর দিলেও দেখা যায় এক বিশেষ ধরনের বৈশিষ্ট্য। তাঁর প্রবন্ধগুলোর বাক্যগঠন পদ্ধতি সমসাময়িক সময়ে খুব একটা পরিচিত ছিল না, এমনকি অত্যন্ত মনোযোগী পাঠকের কাছেও তা কিছুটা জটিল মনে হতে পারে।
প্রাবন্ধিক হিসেবে জীবনানন্দ দাশের পরিচয় এখন পর্যন্ত খুব উচ্চ মর্যাদার আসনে বসানো হয়নি। তা সত্ত্বেও তিনি বেশ কিছু মৌলিক চিন্তাপ্রসূত প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও আলোচনা লিখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৩৬২ বঙ্গাব্দে ‘কবিতার কথা’ নামক প্রবন্ধ সংকলনটি প্রকাশিত হয়, যেখানে তাঁর জীবদ্দশায় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত ১৫টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছিল। এই ১৫টি প্রবন্ধের বাইরেও তাঁর আরও কিছু লেখা রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, তাঁর সাহিত্য, সমাজ ও শিক্ষাসংক্রান্ত রচনার সংখ্যা ৩০টি, গ্রন্থভূমিকা ও আলোচনা ৯টি, স্মৃতিকথা ৩টি এবং বিবিধ প্রবন্ধ ৭টি। এছাড়া আরও সাতটি খসড়া প্রবন্ধের সন্ধান পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, তাঁর অপ্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা এখন আর খুব বেশি নেই।
বুদ্ধদেব বসু ‘কবিতা’ পত্রিকার একটি বিশেষ প্রবন্ধ সংখ্যার (১৩৪৫, বৈশাখ) পরিকল্পনা করেছিলেন মূলত কবিদের গদ্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে। সেই উদ্যোগের সূত্র ধরেই জীবনানন্দ তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘কবিতার কথা’ লিখেছিলেন। প্রবন্ধটির শুরু হয় এভাবে—
“সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি-কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে, এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে। কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্যপ্রাপ্ত হয়; নানা রকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।”
এখানে দেখা যায়, প্রারম্ভিক বাক্যটি ছোট হলেও জীবনানন্দ দ্রুতই দীর্ঘ বাক্যের এক ঘন বুনন তৈরি করেছেন। ‘এবং’, ‘ও’ এর মতো অন্বয়মূলক শব্দ এবং কমা, সেমিকোলন ও ড্যাশের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি এমন এক গদ্যভাষা গড়ে তুলেছেন, যার সঙ্গে তৎকালীন বাঙালি লেখক বা পাঠকদের তেমন কোনো পরিচয় ছিল না।
আঠারো শতকে বাংলা গদ্যের সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত সরল কাঠামোর মাধ্যমে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘বাল্মীকির জয়’ নিয়ে আলোচনা শুরু করেন, তখন তাঁর ভাষা ছিল অত্যন্ত সহজ ও ঋজু। তিনি লিখেছিলেন, “বঙ্গদর্শনে যে সকল প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, পুনর্মুদ্রিত হইলে তাহা বঙ্গদর্শনে সমালোচিত হইয়া থাকে না। “বাল্মীকির জয়” কিয়দংশে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হইয়াছিল, কিন্তু গ্রন্থের অধিকাংশই বঙ্গদর্শনে বাহির হয় নাই। উহার যে অংশ প্রকাশিত হইয়াছিল, তাহাও বিশেষরূপে পরিবর্তিত হইয়া পুনর্মুদ্রিত হইয়াছে। এ অবস্থায় আমরা সমালোচ্য গ্রন্থ বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হইয়াছিল বলিয়া স্বীকার করিতে পারি না। অতএব পাঠক যদি অনুমতি করেন, তবে ইহার সমালোচনায় প্রবৃত্ত হই। সম্পাদকের অনুমতি পাইয়াছি।”
বঙ্কিমচন্দ্রের এই গদ্যে বাক্যের দৈর্ঘ্য ছিল সীমিত এবং প্রতিটি বাক্য একটি সাধারণ বক্তব্য বহন করত। এই সরলতা প্রমথ চৌধুরীর রচনায়ও বজায় ছিল। প্রমথ চৌধুরী বাংলা গদ্যকে এক দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরোয়া’ নিয়ে তাঁর আলোচনা থেকে এই স্পষ্টতা বোঝা যায়। তিনি লিখেছিলেন, “শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “ঘরোয়া” পড়লুম। চমত্কার বই। ঘরোয়া মানে ঠাকুর পরিবারের ঘরের কথা. . .অবনীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র এবং স্বগুণে স্বনামধন্য, সুতরাং তাঁর কোনও পরিচয় দেওয়া অনাবশ্যক। তিনি চিত্রবিদ্যায় একজন আর্টিস্ট বলে দেশে–বিদেশে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জ্জন করেছেন। কিন্তু এ পুস্তকে তিনি নিজের কৃতিত্ব বিষয়ে কোনও কথা উল্লেখ করেন নি। তিনি ঠাকুর পরিবারের ঘরোয়া কথা বলেছেন। পূর্ব্বে বলেছি, এ পুস্তক ঠাকুর পরিবারের ইতিহাস নয়, তাই বলে উপন্যাসও নয়।”
অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্য ছিল মননশীলতায় সমৃদ্ধ, অথচ সেখানে কোনো জটিলতা ছিল না। কার্তিক ১৩৩৮ সংখ্যায় ‘পরিচয়’ পত্রিকায় জগদীশ গুপ্তর ‘লঘু-গুরু’ উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি সাহিত্যের মান নিয়ে লিখেছিলেন, “সাহিত্যে সম্মানের অধিকার বহির্নির্দিষ্ট শ্রেণী নিয়ে নয়, অন্তর্নিহিত চরিত্র নিয়ে। অর্থাৎ, পৈতে নিয়ে নয়, গুণ নিয়ে। আধুনিক একদল লেখক পণ করেছেন তাঁরা পুরাতনের অনুবৃত্তি করবেন না। কোনোকালেই অনুবৃত্তি করাটা ভালো নয়, এ কথা মানতেই হবে। নরসংহিতাসম্মত ফোঁটা—তিলকটা, আধুনিকতাও গতানুগতিক হয়ে ওঠে। সেটার অনুবৃত্তিও দুর্বলতা। চন্দনের তিলক যখন চলতি ছিল, তখন অধিকাংশ লেখা চন্দনের তিলকধারী হয়ে সাহিত্যে মান পেতে চাইত। পঙ্কের তিলকই যদি সাহিত্যসমাজে চলতি হয়ে ওঠে, তা হলে পঙ্কের বাজারও দেখতে দেখতে চড়ে যায়।” রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিন্তাচেতনাকে অত্যন্ত সুললিত ও বোধগম্য ভঙ্গিতে প্রকাশ করতে জানতেন।
তবে সমসাময়িক সময়ে মোহিতলাল মজুমদার তাঁর গদ্যে জটিল বাক্যরীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের আলোচনায় তিনি লিখেছিলেন, “এই যে তারাশঙ্কর, ইনিই যখন জীবনের শিল্পরূপ নির্মাণ করেন, যেমন তাঁহার গল্পগুলিতে করিয়াছেন, তখন যে তাহাতে একটা সম্পূর্ণ নূতন ধরনের রসসৃষ্টি হইবে, ইহাই তো স্বাভাবিক। সে রস বাস্তবের রসই বটে, কিন্তু তাহার অন্তরালে একটা নির্মম অনাসক্ত তান্ত্রিক-দৃষ্টি আছে; সেই দৃষ্টি যখন নর-নারীর হৃদয়মধ্যেও উঁকি দিয়াছে তখন তাহা খাঁটি আর্টিস্টের নির্মমতায় পরিণত হইয়া, সর্বসংস্কারমুক্তির যে-আনন্দ সেই আনন্দের রস-সৃষ্টি করিয়াছে। ইহাই তারাশঙ্করের আর্ট, আমি তাহাকে একরূপ তান্ত্রিক রস-প্রেরণা বলিয়াছি; ইহার স্থূল দৃষ্টান্ত হিসাবে, তাঁহার গল্পে নর-নারীর প্রেম ও প্রেম-বিকারগুলি স্মরণ করিয়া বলি, সেই প্রেমে নীতি-দুর্নীতির সংস্কার নাই, আছে কেবল প্রত্যেক চরিত্রে সেই প্রবৃত্তির রক্তগত সংস্কার।”
মোহিতলাল একটি বাক্যের ভেতরেই একাধিক অণুবাক্য ধারণ করার চেষ্টা করেছেন, যার ফলে বাক্য দীর্ঘ ও জটিল হয়ে উঠেছে। তিনি মূল বাক্যের সাথে যতিচিহ্ন ব্যবহার করে নতুন বাক্য জুড়ে দিয়ে বক্তব্যকে সংহত করেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ বা বিশ শতকের শুরুতে এই ধরনের বাক্যকাঠামো প্রথম কে প্রবর্তন করেছিলেন তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন, তবে এর ফলে বাংলা গদ্যের আঙ্গিক ও স্বাদ বদলে গিয়েছিল এবং বক্তব্য প্রকাশের গভীরতা বেড়েছিল। জীবনানন্দের গদ্য এই ধারারই এক উচ্চতর রূপ। তাঁর গদ্যভাষায় দীর্ঘ বাক্যের মাধ্যমে বহুমাত্রিক বক্তব্য ধারণের চেষ্টা দেখা যায়। শুধু বাক্য গঠন নয়, তাঁর শব্দচয়নও ছিল অনন্য। তিনি অক্লেশে তৎসম শব্দের আশ্রয় নিয়েছেন এবং সমাসবদ্ধ পদের মাধ্যমে গদ্যের প্রকাশক্ষমতাকে বিস্তৃত করেছেন।
জীবনানন্দ একই বাক্যে বক্তব্যের নিহিতার্থ, শর্ত, বিশেষায়িত টীকা এবং সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাকে ধারণ করেছেন। তিনি পূর্ণ যতির বদলে অর্ধ-যতি ব্যবহার করে একটি পূর্ণ বাক্যের সাথে আরেকটি বাক্য যুক্ত করেছেন, যা বাক্যের দৈর্ঘ্য বাড়িয়েছে এবং জটিলতা তৈরি করেছে। এতে ভাষার নির্মলতা কিছুটা কমলেও গদ্যে এক ধরনের সুললিত দৃঢ়তা এসেছে, যা গভীর ও সূক্ষ্ম চিন্তাকে ধারণ করতে সক্ষম। এই রীতি ইউরোপীয় প্রবন্ধ সাহিত্যের গদ্যরীতির সাথে অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
চিন্তা ও উপলব্ধির গভীরতার ওপর ভিত্তি করেই ভাষার চারিত্র্য নির্ধারিত হয়। জীবনানন্দ তাঁর মননশীলতা ও অন্তর্দৃষ্টির সাথে সংগতি রেখে একটি স্বতন্ত্র গদ্যকাঠামো তৈরি করতে পেরেছিলেন। তাঁর গদ্যভঙ্গির বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে এই দীর্ঘ উদ্ধৃতিতে—
“...আমি বলতে চাই না যে কাব্যের সঙ্গে জীবনের কোনো সম্বন্ধ নেই; সম্বন্ধ রয়েছে, কিন্তু প্রসিদ্ধ প্রকটভাবে নেই। কবিতা ও জীবন একই জিনিসেরই দুই রকম উত্সারণ; জীবন বলতে আমরা সচরাচর যা বুঝি তার ভিতর বাস্তব নামে আমরা সাধারণত যা জানি তা রয়েছে, কিন্তু এই অসংলগ্ন অব্যবস্থিত জীবনের দিকে তাকিয়ে কবির কল্পনা-প্রতিভা কিংবা মানুষের ইমাজিনেশন সম্পূর্ণভাবে তৃপ্ত হয় না; কিন্তু কবিতা সৃষ্টি করে কবির বিবেক সান্ত্বনা পায়, তার কল্পনা-মনীষা শান্তি বোধ করে, পাঠকের ইমাজিনেশন তৃপ্তি পায়। কিন্তু সাধারণত বাস্তব বলতে আমরা যা বুঝি তার সম্পূর্ণ পুনর্গঠন তবুও কাব্যের ভিতর থাকে না; আমরা এক নতুন প্রদেশে প্রবেশ করেছি। পৃথিবীর সমস্ত জল ছেড়ে দিয়ে যদি এক নতুন জলের কল্পনা করা যায় কিংবা পৃথিবীর সমস্ত দীপ ছেড়ে দিয়ে এক নতুন প্রদীপের কল্পনা করা যায়, তাহলে পৃথিবীর এই দিন, রাত্রি, মানুষ ও তার আকাঙ্ক্ষা এবং সৃষ্টির সমস্ত ধুলো সমস্ত কঙ্কাল ও সমস্ত নক্ষত্রকে ছেড়ে দিয়ে এক নতুন ব্যবহারের কল্পনা করা যেতে পারে। যা কাব্য—অথচ জীবনের সঙ্গে যার গোপনীয় সুড়ঙ্গলালিত সম্পূর্ণ সম্বন্ধ; সম্বন্ধের ধূসরতা ও নূতনতা। সৃষ্টির ভিতর মাঝে মাঝে এমন শব্দ শোনা যায়, এমন বর্ণ দেখা যায়, এমন আঘ্রাণ পাওয়া যায়, এমন মানুষের বা এমন অমানবীয় সংঘাত লাভ করা যায় কিংবা প্রভূত বেদনার সঙ্গে পরিচয় হয় যে মনে হয় এই সমস্ত জিনিসই অনেক দিন থেকে প্রতিফলিত হয়ে কোথাও যেন ছিল; এবং ভঙ্গুর হয়ে নয়, সংহত হয়ে, আরও অনেক দিন পর্যন্ত, হয়তো মানুষের সভ্যতার শেষ জাফরান রৌদ্রলোক পর্যন্ত, কোথাও যেন রয়ে যাবে; এইসবের অপরূপ উদ্গীরণ ভিতর এসে হৃদয়ে অনুভূতির জন্ম হয়, নীহারিকা যেমন নক্ষত্রের আকার ধারণ করতে থাকে তেমনি বস্তু-সঙ্গতির প্রসব হতে থাকে যেন হৃদয়ের ভিতরে; এবং সেই প্রতিফলিত অনুচ্চারিত দেশ ধীরে ধীরে উচ্চারণ করে ওঠে যেন সুরের জন্ম হয়; এই বস্তু ও সুরের পরিণয় শুধু নয়, কোনো কোনো মানুষের কল্পনামনীষার ভিতর তাদের একাত্মতা ঘটে, কাব্য জন্ম লাভ করে।”
জীবনানন্দ তাঁর গদ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বাক্য-পদ-স্থাপনার রীতি অনুসরণ করলেও তাঁর মূল অবদান ছিল একই কাঠামোর ভেতর যুক্তিসম্মত বিবিধ বাক্য ও অণুবাক্যের সমাবেশ। তিনি লৌকিক ভাষার শিথিলতা দূর করে বাংলা গদ্যকে গভীর মননশীল বক্তব্য প্রকাশের এক অপরিমেয় শক্তি দিয়েছেন।
জীবনানন্দের অধিকাংশ গদ্য রচনাই ছিল ফরমায়েশি, যা মূলত সাহিত্য, শিক্ষা ও সমাজ—এই তিনটি ক্ষেত্রে বিভক্ত। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘কবিতার কথা’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা’, ‘মাত্রাচেতনা’, ‘উত্তররৈবিক বাংলা কাব্য’, ‘কবিতার আত্মা ও শরীর’, ‘কি হিসাবে কবিতা শাশ্বত’, ‘কবিতাপাঠ’, ‘দেশকাল ও কবিতা’, ‘সত্যবিশ্বাস ও কবিতা’, ‘রুচি, বিচার ও অন্যান্য কথা’, ‘কবিতার আলোচনা’, ‘আধুনিক কবিতা’, ‘বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ’, ‘কেন লিখি’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘শরত্চন্দ্র’, ‘কঙ্কাবতী ও অন্যান্য কবিতা’, ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’, ‘পৃথিবী ও সময়’, ‘যুক্তি, জিজ্ঞাসা ও বাঙালি’, ‘অর্থনৈতিক দিক’, ‘শিক্ষা ও ইংরেজি’, ‘শিক্ষা-দীক্ষা-শিক্ষকতা’, ‘শিক্ষার কথা’, ‘শিক্ষা সাহিত্যে ইংরেজী’ ও ‘শিক্ষা-দীক্ষা’।
বিশেষ করে কবিতা নিয়ে তাঁর লেখা প্রবন্ধগুলো বহুমাত্রিক মৌলিক চিন্তার স্বাক্ষর বহন করে। তাঁর গদ্যভঙ্গি এই জটিল চিন্তাসূত্রগুলোকে ধারণ করতে সহায়তা করেছে। শব্দ প্রয়োগের নৈপুণ্য এবং বাক্যগঠনের সুচারু দক্ষতা তাঁর ভাষাকে শিল্পসম্মত সাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত করেছে, যা কখনোই অন্তঃসারশূন্য বাক্চাতুর্য হয়ে দাঁড়ায়নি। জীবনানন্দের গদ্য গভীর অনুভূতির এক চৌকস প্রকাশ, যা বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের সম্ভাবনাকে বৈশ্বিক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
ব্রাসেলস, ১১ অক্টোবর ২০০৬