২০০৮ সালের ২৪ অক্টোবর মুক্তকণ্ঠের সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত এই লেখাটি দীর্ঘকাল কেবল ছাপানো কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল। আজ অন্যঅইন পাঠকদের জন্য তা পুনরায় তুলে ধরা হলো।

জীবনানন্দ দাশের প্রতি আমাদের আগ্রহ এবং বিস্ময় যেন অন্তহীন। বিশ শতকের অন্য কোনো বাঙালি কবি আমাদের কল্পনায় তাঁর মতো এত প্রবল প্রভাব ফেলেননি। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কথা মাথায় রেখেই বলা যায়, জীবনানন্দের কবিতা সব বয়সের বাঙালি পাঠককে যেভাবে আলোড়িত করে, তা বিরল। তাঁর কবিতার যে চিত্রময়তা, তার সঙ্গে আমরা খুব সহজেই ঘনিষ্ঠতা অনুভব করি এবং এটাই তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। জীবনানন্দ প্রকৃতির যে বর্ণনা দিয়েছেন, বাস্তবে আমরা এখন আর তা খুঁজে পাই না। সম্ভবত সেই হারানো সৌন্দর্যকে নিজের মনে করে আমরাই আরও প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরি। তবে আমার মনে হয়, এর চেয়ে বড় কারণ হলো জীবনানন্দের কবিতার সাবজেক্টিভিটি। একই কবিতা একেকজনের কাছে একেকভাবে ধরা দেয়। অনেক সময় তাঁর ব্যবহৃত শব্দচিত্র আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। সম্রাট বিম্বিসার কে বা বিদর্ভ নগর কোথায়, তা না জেনেই আমরা মনে মনে নিজস্ব এক চিত্র ও ধ্বনির জগৎ তৈরি করি। তাঁর কবিতার সুর সামগ্রিকভাবে বিষণ্ন, সবচেয়ে উজ্জ্বল রংটিও ধূসর; তা সত্ত্বেও এই কবির কবিতায় আমরা ব্যক্তিগত প্রণোদনার উৎস খুঁজে পাই। কিটস ছাড়া অন্য আর কোনো কবিকে আমরা এভাবে ‘যে যার মতো’ করে আবিষ্কার করি না।

বাংলার বাইরে জীবনানন্দ দাশের পরিচিতি কার্যত শূন্য। অন্য ভাষার কথা বাদ দিলেও ইংরেজি অনুবাদ খুব বেশি হয়নি। বুদ্ধদেব বসুর উৎসাহে তিনি নিজে কয়েকটি কবিতা অনুবাদ করেছিলেন। লীলা রায় ও হুমায়ুন কবিরের করা বেশ কিছু অনুবাদ আমি পড়েছি। সম্প্রতি বাংলাদেশে ফখরুল আলম জীবনানন্দের কবিতার একটি সরল ও সুপাঠ্য অনুবাদ সংকলন প্রকাশ করেছেন। ইংরেজি কবি জো উইন্টার সরাসরি বাংলা থেকে জীবনানন্দের কবিতা অনুবাদ করেছেন। তিনি ‘বেঙ্গল দ্য বিউটিফুল’ নামে ‘রূপসী বাংলা’ এবং ‘নেকেড লোনলি হ্যান্ড’ নামে নির্বাচিত কবিতার চমৎকার অনুবাদ প্রকাশ করেছেন। কোথাও কোথাও আক্ষরিক ও সরলীকৃত ভাষান্তর হলেও, বাঙালি কবির ধ্বনিচিত্র তিনি যেভাবে রূপান্তরিত করেছেন, তা মুগ্ধ করার মতো। মার্কিন লেখক ও ভাষাবিদ ক্লিনটন সিলি, যাঁর বাংলা ভাষাজ্ঞান ও সাহিত্যবোধ বিস্ময়কর, তিনি ইংরেজি ভাষায় জীবনানন্দের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনী ও কবিতার ব্যাখ্যা লিখেছেন। ‘আ পোয়েট অ্যাপার্ট’ নামের সেই জীবনীগ্রন্থে সিলি জীবনানন্দের কবিতা থেকে প্রচুর উদাহরণ ব্যবহার করেছেন। ইংরেজ কবি উইলিয়াম রাদিচি সিলির এই অনুবাদ ও ব্যাখ্যাকে সঠিক ও যোগ্য বলে প্রশংসা করেছেন।

তবে আমার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সিলি নন, বরং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এডওয়ার্ড ডিমক। তিনি বৈষ্ণব সাহিত্য ও রবীন্দ্রনাথকে গভীর প্রজ্ঞা ও ভালোবাসার সঙ্গে বিশ্ব পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ওপর বাউল সাহিত্যের, বিশেষ করে লালনের গানের প্রভাব নিয়ে তাঁর আলোচনা একদিকে যেমন পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেয়, অন্যদিকে বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার প্রমাণ দেয়। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় ভাষা ও সভ্যতা বিভাগটি ডিমকের নিজ হাতে গড়া। জীবনানন্দের সঙ্গে সিলির পরিচয় এই ডিমকের মাধ্যমেই হয়েছিল। ডিমক ও বুদ্ধদেব বসু উভয়েই তাঁকে জীবনানন্দ নিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করেছিলেন। ডিমক নিজে জীবনানন্দ নিয়ে কোনো বই লিখেননি, তবে বিভিন্ন বক্তৃতা ও গবেষণাধর্মী প্রবন্ধের মাধ্যমে এই বাঙালি কবিকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করিয়েছেন। বর্তমান আলোচনায় আমরা অধ্যাপক ডিমকের ভাষ্যে জীবনানন্দের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতাটির দিকে নজর দেব। ১৯৭৪ সালের আগস্ট মাসে ‘দ্য জার্নাল অব এশিয়ান স্টাডিস’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘কবি যখন প্যাঁচা ও ইঁদুর’।

ডিমকের বিবেচনায় বাংলা কবিতার দুটি ধারা—একটি ধ্রুপদি, অন্যটি আধুনিক। এই দুই ধারার একদিকে রবীন্দ্রনাথ, যিনি বাংলা ধ্রুপদি ধারার শেষ কবিদের একজন অন্যদিকে জীবনানন্দ, যিনি ‘আধুনিক’ বাঙালি কবিদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য। জীবনানন্দ ছিলেন ‘কল্লোল’ যুগের কবি, আর এই গোষ্ঠীর সদস্যরা একসময় রবীন্দ্রনাথকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। ফলে ডিমকের মতে, কবি হিসেবে তাঁদের দুজনের মধ্যে একটি চেতনাগত বৈপরীত্য বিদ্যমান। এই দুই কবির এবং কার্যত দুই কাব্যধারার মিল ও অমিল বোঝাতে ডিমক ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতাটিকে রবীন্দ্রনাথের ‘বিদায়-রীতি’র সাথে তুলনা করেছেন। দুটি কবিতারই মূল বিষয় মৃত্যুচিন্তা। জীবনানন্দের কবিতায় মৃত্যু যেখানে বিষণ্ন, নির্জন ও ভয়াবহ, সেখানে রবীন্দ্রনাথের চোখে মৃত্যু ‘শান্ত, নিয়মবদ্ধ এমনকি হাস্যমধুর’।

‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতাটি অত্যন্ত বিষণ্ন এবং এক অর্থে মরবিড। গলায় ফাঁস দিয়ে এক পুরুষের আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে কবিতাটির শুরু। কেন এই মৃত্যু, তার ব্যাখ্যায় জানা যায় যে ওই পুরুষের কোনো ব্যক্তিগত দুঃখ ছিল না। তিনি একজন গৃহী, স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে সুখী জীবন যাপন করেছেন। তা সত্ত্বেও তিনি মৃত্যুকে বেছে নিয়েছেন, কারণ—

“নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ নয় সবখানি।

অর্থ নয়, কীর্তি নয়-সচ্ছলতা নয়—

আরো এক বিপন্ন বিস্ময়

আমাদের রক্তের ভেতর খেলা করে

লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই:

তাই।”

জীবনানন্দ ‘কল্লোল’ যুগের কবি, আর এই কল্লোল কবি গোষ্ঠীর সদস্যরা একসময় রবীন্দ্রনাথকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। ফলে ডিমকের বিবেচনায় কবি হিসেবে তাঁদের দুজনের মধ্যে একটি চেতনাগত বৈপরীত্য আছে। এই দুই কবির মধ্যে, কার্যত এ দুই কাব্যধারার মধ্যে মিল ও অমিল কোথায়, তা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ডিমক ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতাটিকে রবীন্দ্রনাথের ‘বিদায়-রীতি’র প্রতি তুলনা হিসেবে উপস্থিত করেছেন।

বুদ্ধদেব বসু আমাদের জানিয়েছেন, কবিতাটি যদি এখানেই শেষ হতো তবে তা উল্লেখযোগ্য হতো না। কিন্তু কবিতার শেষ পাদে এসে কবি মৃত্যুর বদলে জীবনের জয়ধ্বনি শুনিয়েছেন, আর সে কারণেই এটি বিশেষ হয়ে উঠেছে। একটি বুড়ো পেঁচা, যে অন্ধকারে জেগে থাকে কিন্তু আত্মহত্যায় উদ্যত পুরুষটিকে বাধা দেয় না, কবি তাকে ফিরিয়ে আনেন এবং তার মুখে শোনান আদিম আনন্দের কথা। ‘আর এই প্রগাঢ় পিতামহীর দৃষ্টান্তে কবি উদ্বুদ্ধ হলেন—“আমরা দুজনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।” এভাবে মৃত্যু পার করে বেজে উঠল জীবনের জয়ধ্বনি আর সেই সঙ্গে নির্বোধ ও পাশবিক জীবনের প্রতি চৈতন্যের বিদ্রূপ।’

এই কবিতা নিয়ে সমালোচনার জবাবে জীবনানন্দ কিছুটা আত্মরক্ষামূলক ভাষায় বলেছিলেন যে, এটি তাঁর সেরা বা প্রতিনিধিত্বমূলক কবিতা নয়। তাঁর যুক্তি ছিল, এই কবিতা ‘সাবজেক্টিভ নয়, একটা ড্রামাটিক রিপ্রেজেন্টেশন মাত্র’। অর্থাৎ, কথাগুলো কবি নিজের বিষয়ে বলছেন না এবং এখানে আত্মহত্যার সপক্ষে কোনো যুক্তি নেই। একজন সমালোচক এই কবিতার উদাহরণ দিয়ে জীবনানন্দ দাশকে ‘আত্মঘাতী ক্লান্তি’র অভিযোগে আক্রমণ করেছিলেন। কিন্তু এই ক্লান্তি কবির ব্যক্তিগত নয়, যেমন হ্যামলেট বা ম্যাকবেথের ক্লান্তি শেক্সপিয়ারের ব্যক্তিগত নয়। প্রকৃতপক্ষে জীবনানন্দের মতে, কবিতাটির সুর মোটেই আত্মঘাতী নয়। কবিতার শেষে দেখা যায় ‘প্রকৃতির প্রাচুর্য ও ইতিহাসের প্রাণশক্তির সঙ্গে একাত্ম করে আনন্দিত করে রেখেছে কবিকে’। এটাই কবিতার মূল সুর ও কথা।

ডিমক সম্ভবত জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব বসুর ব্যাখ্যার কথা জানতেন। তিনি সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হলেও কবিতার একটি গভীরতর অর্থ খুঁজে পেয়েছেন, যা অন্য কোনো বাঙালি বা ভারতীয় লেখকের কাছে ধরা পড়েছে বলে আমার জানা নেই। ডিমকের প্রস্তাব হলো, ইউরোপীয় চেতনায় মুগ্ধ এই কবি ‘জন্ম ও মৃত্যু তাত্পর্যার্থে অভিন্ন’, এই ভারতীয় দর্শন ও মতবাদের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং কবিতায় তার একটি ‘প্রতীকী আড়াল’ তৈরি করেছেন। এর প্রমাণ হিসেবে ডিমক উপনিষদের একটি শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন, যার বাংলা অর্থ হলো: ‘আমি খাদ্য, আমি খাদ্য, আমি খাদ্যের খাদক, আমি খাদ্যের খাদক..। আমি খাদ্য যে খাদ্যের খাদককে ভক্ষণ করে। আমি বিশ্বকে পদানত করি।’

ডিমকের মতে, খাদ্য গ্রহণ এবং খাদ্য হয়ে যাওয়া আসলে ‘জীবন’ ও ‘মৃত্যু’—জীবনের এই দুই রূপকে প্রকাশ করে। জীবন ও মৃত্যু আসলে একটি বাইনারি বা বিপরীতমুখী অস্তিত্বের দুটি রূপ। মৃত্যুর মাধ্যমে জীবনের সমাপ্তি ঘটে না, বরং জীবন অস্তিত্বের এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে প্রবেশ করে। ডিমকের যুক্তি, এই কবিতায় জীবনের (ও মৃত্যুর) সেই বাইনারি রূপ প্রকাশ পেয়েছে। এখানে পেঁচাকে দ্ব্যর্থবোধক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। পেঁচা মৃত্যুর প্রতীক, যার বেঁচে থাকা নির্ভর করে অন্য জীবনের ওপর, যা এখানে ইঁদুরের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। যে পুরুষের আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, মৃত্যুর খাদ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সে নিজের অমরত্ব লাভ করে। অর্থাৎ, যা মৃত্যু, তা-ই জীবন। ডিমকের ব্যাখ্যায় জীবনানন্দ একই সঙ্গে জীবন ও মৃত্যুর কথা বলছেন। ‘জীবন মানে ক্ষয়, যার অর্থ মৃত্যু, যার অর্থ জীবন।’ কবি কেবল একবার ‘মর্গ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, অন্যথায় তিনি বলেছেন ‘লাশকাটা ঘর’। অর্থাৎ, এই শবের ভেতরেও জীবনের সম্ভাবনা আছে; এখানে শুধু মৃত্যু নয়, জীবন বা জীবনের সম্ভাবনা বাস করে। লাশকাটা ঘরে মৃত পুরুষটি অপেক্ষা করে সেই চিকিৎসকদের জন্য, যারা জীবন দীর্ঘায়িত করার সম্ভাবনা খুঁজছেন। ডিমক মনে করিয়ে দিয়েছেন, মৃত্যুর এক অর্থ অন্ধকার, কিন্তু এই অন্ধকারেই পেঁচা তার শিকার খুঁজে পায়, যা তার জীবন বাঁচিয়ে রাখে। অন্ধকারের কোনো রং নেই, তবু সেখানে জোনাকি আলো ছড়ায়। তার মানে যা জীবন, তা-ই মৃত্যু; যা অন্ধকার, তা-ই আলো। এই কবিতার গূঢ়ার্থ হলো, সময়ের প্রতিটি মুহূর্তে জীবন ও মৃত্যু অস্তিত্বের এই দুই প্রকাশের ভেতর মূর্ত। ডিমক জীবনানন্দের এই কবিতাকে ‘পীড়াদায়ক’ এবং কবিকে ‘আহত-পীড়িত’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বিপরীতে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুবোধ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই কথা উল্লেখ করে ডিমক ‘বিদায়-রীতি’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত করেছেন:

ডিমক সম্ভবত জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব বসুর ব্যাখ্যার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। সে ব্যাখ্যার সঙ্গে তিনি স্পষ্টতই মতৈক্য পোষণ করেন, কিন্তু পাশাপাশি এ কবিতার একটি গভীরতর অর্থও তাঁর কাছে ধরা পড়ে, যা অন্য কোনো বাঙালি বা ভারতীয় লেখক-পাঠকের কাছে ধরা পড়েছে বলে আমি জানি না। ডিমকের প্রস্তাব, প্রবলভাবে ইউরোপীয় চেতনায় মুগ্ধ এই কবি ‘জন্ম ও মৃত্যু তাত্পর্যার্থে অভিন্ন’, এই ভারতীয় দর্শনচিন্তা ও মতবাদের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং এ কবিতায় সে কথারই একটি ‘প্রতীকী আড়াল’ নির্মাণ করেছেন।

“হায় গো রানী, বিদায়বাণী/এমনি করে শোনে?/ছি ছি, ওই যে হাসিখানি/কাঁপছে আঁখিকোণে!/এতই বারে বারে কি রে/মিথ্যা বিদায় নিয়েছি রে,/ভাবছ তুমি মনে মনে/লোকটি নয় যাবার—/দ্বারের কাছে ঘুরে ঘুরে/ফিরে আসবে আবার।/...একটুখানি মোহ তবু/মনের মধ্যে রাখো,/মিথ্যাটারে একেবারেই/জবাব দিয়ো নাকো!/ভ্রমক্রমে ক্ষণেক-তরে/এনো গো জল আঁখির ’পরে/আকুল স্বরে যখন কব/‘সময় হলো যাবার’।/তখন নাহয় হেসো, যখন/ফিরে আসব আবার।”

উল্লেখ্য যে, জীবনানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ উভয়েই এই কবিতাগুলো লিখেছিলেন যখন তাঁদের বয়স ছিল ৩৯-৪০ বছর। জীবনানন্দের ‘ক্লান্তিকর ও পীড়িত’ আত্মার বিপরীতে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মৃত্যু প্রশান্ত এবং সেখানে হাসিঠাট্টাও আছে। জীবন মানেই গভীর বেদনার সাগর নয়; তিনি জীবনকে একটি চক্রের ঘূর্ণনরত অস্তিত্ব হিসেবে দেখেন। এই চক্রে জীবন, মৃত্যু ও পুনরায় জীবন বিদ্যমান। সেই চক্র অনুযায়ী মৃত্যুর পর জীবনের পুনঃপ্রত্যাবর্তন পূর্বনির্ধারিত। তিনি নিশ্চিত যে তাঁর প্রত্যাবর্তন হবেই, কারণ ‘মৃত্যু প্রকৃতির অংশ এবং প্রকৃতি নিয়মবদ্ধ’। কবিতা দুটির পাঠ থেকে বোঝা যায়, জীবনানন্দের কাছে মৃত্যু সহিংস ও বিশৃঙ্খল, আর রবীন্দ্রনাথের কাছে তা শান্তিময় ও নিয়মবদ্ধ। তবে ডিমক মনে করেন, এই বিপরীত বোধই কবিতার মুখ্য প্রভেদ নয়। আপাত অমিল থাকলেও তাঁদের বক্তব্যের মধ্যে একটি অন্তর্গত ঐক্য আছে। রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ কেউই মৃত্যুর অমোঘতায় বিশ্বাসী নন; মৃত্যুই জীবনের শেষ কথা নয়। জীবনানন্দের কাছে মৃত্যু ও জীবন একে অপরের অন্তর্বর্তী, আর রবীন্দ্রনাথের কাছে তারা অনুবর্তী। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য মূলত সময় বা মহাকাল নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের কাছে সময় রাজকীয় ছন্দে প্রকাশিত হয়, যা একবার উত্থিত হয়ে আবার সমুদ্রগর্ভে মিলিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ ডিমক বলাকা কাব্যের ‘শাহজাহান’ কবিতার কথা বলেছেন:

“এ কথা জানিতে তুমি, ভারত-ঈশ্বর শা-জাহান,/কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধনমান।/চিরন্তন হয়ে থাক সম্রাটের ছিল এ সাধনা।/রাজশক্তি বজ্র সুকঠিন/সন্ধ্যারক্তরাগসম তন্দ্রাতলে হয় হোক লীন,/কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস/নিত্য-উচ্ছ্বসিত হয়ে সকরুণ করুক আকাশ/এই তবে মনে ছিল আশ।/হীরামুক্তা মাণিক্যের ঘটা/যেন শূন্য দিগন্তের ইন্দ্রজাল ইন্দ্রধনুচ্ছটা/যায় যদি লুপ্ত হয়ে যাক।/শুধু থাক কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল/এ তাজমহল।”

রবীন্দ্রনাথের কাছে সময় বাস্তব ও প্রামাণিক। ‘কিন্তু জীবনানন্দের চোখে কাল বা সময়ের স্বতন্ত্র কোনো অর্থ নেই’। জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় অনায়াসেই এক কাল থেকে অন্য কালে বা হাজার বছরের পরিব্রাজনে সক্ষম।

গতকাল, বর্তমান বা নিঃসীম আগামীকাল—সময়ের এই সব প্রকাশ জীবনানন্দের কাছে সমার্থক। ‘তাদের শুধু ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে, ভিন্ন ভিন্ন রূপ বা আকার রয়েছে। ইঁদুর ও পেঁচার মতো, তারাও আসলে অভিন্ন, সমার্থক’।

ভিন্ন পথে এগোলেও ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতাটি নিয়ে বুদ্ধদেব বসু ও অধ্যাপক এডওয়ার্ড ডিমক কার্যত একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তাঁদের মতে, এই কবিতা কেবল ‘আত্মঘাতী ক্লান্তি’র বিবরণ বা মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণের যুক্তি নয়, বরং এতে জীবনের সপক্ষে জোরালো উচ্চারণ রয়েছে। বুদ্ধদেব একে বলেছেন ‘জীবনের জয়ধ্বনি’, আর ডিমক একে নাম দিয়েছেন ‘জীবনের প্যারাডক্স’। এটি প্যারাডক্স কারণ আপাতদৃষ্টিতে সুরটি হতাশার মনে হলেও, জীবন ও মৃত্যুর ভেদাভেদ মুছে ফেললে এক গভীর সদর্থক অর্থ ধরা পড়ে। কবিকে একই সঙ্গে পেঁচা ও ইঁদুর অর্থাৎ জীবন ও মৃত্যুর আধার বলার নির্দেশনাটি হয়তো সরাসরি ‘আশাবাদ’ মনে হয় না। তবে জীবনানন্দ নিজেই বলেছেন, কবিতার কাজ মুগুরভাজা আশাবাদ ব্যক্ত করা নয়। কবির হৃদয়ের কল্পনা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যে মানসচৈতন্য তৈরি হয়, তা আপাত নিরাশাবাদী হলেও অত্যন্ত উজ্জ্বল ও আন্তরিক, যাকে আশাবাদ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র এই কবির অনেক কবিতাতেই এই প্যারাডক্স দেখা যায়। এমনকি ‘বনলতা সেন’ কবিতায়ও কি আমরা বিষণ্ন ও অন্ধকারময় অভিজ্ঞতার ধ্বনি পাই না? অথচ কবিতাটি শেষ হয় এই কথায়, ‘থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন,’ যেখানে সুরটি প্রত্যাখ্যানের নয়, বরং গ্রহণের। বাইরে অন্ধকার থাকলেও অন্তর্গত চৈতন্যে তখন উজ্জ্বল আলো। যাকে প্রথমে হতাশা মনে হয়, তা-ই শেষ পর্যন্ত আশা ও উত্তরণে পরিণত হয়, ঠিক যেমন ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায় ঘটেছে।

অধ্যাপক এডওয়ার্ড ডিমক জীবনানন্দের কবিতার সেই ধনাত্মক সুরটি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, তাঁকে ধন্যবাদ।

১৬ সেপ্টেম্বর ২০০৮, নিউইয়র্ক