জলবায়ু পরিবর্তন, মোংলাকেন্দ্রিক শিল্পকারখানা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণসহ নানা কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন নানামুখী সংকটের মধ্যে আছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানিসংকট নিরসনে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য জায়গা হিসেবে ভাবা হচ্ছে সুন্দরবনের ভেতর জীববৈচিত্র্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আকরাম পয়েন্ট ও সুন্দরবন–সংলগ্ন নলিয়ান গ্রাম।

সুন্দরবনের শিবসা ও পশুর নদ যেখানে মিলেছে, সেই মোহনা আকরাম পয়েন্ট। এই পয়েন্টের দুই কিলোমিটারের মধ্যে এক পাশে সুন্দরবন দক্ষিণ বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য ও অন্য পাশে সুন্দরবন পূর্ব বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য। এ দুটি অভয়ারণ্যই জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব–ঐতিহ্যের অংশ।

শিবসা নদী–সংলগ্ন নলিয়ান গ্রামের বিপরীতে দুই কিলোমিটারের মধ্যে আছে আরেকটি অভয়ারণ্য। নলিয়ান সুন্দরবনের অংশ না হলেও এটি সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার অংশ। শিবসা নদীর সঙ্গে এ গ্রামের অবস্থান।

গত ১৩ আগস্ট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এক অনুষ্ঠানে খুলনার হিরণ পয়েন্ট, মোংলা ও পায়রায় তিন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে বলে জানান। এরপর ১৯ অক্টোবর রাজধানীর একটি হোটেলে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে খুলনার কাছে ২০ মিটার ড্রাফট আছে, এমন স্থানে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কথা জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সুন্দরবনের শিবসা ও পশুর নদ যেখানে মিলেছে, সেই মোহনা আকরাম পয়েন্ট। এই পয়েন্টের দুই কিলোমিটারের মধ্যে এক পাশে সুন্দরবন দক্ষিণ বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য ও অন্য পাশে সুন্দরবন পূর্ব বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য। এ দুটি অভয়ারণ্যই জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব–ঐতিহ্যের অংশ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বনবিশেষজ্ঞ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয় কোন পদ্ধতিতে পাইপলাইন নেবে, সেটা দেখার বিষয়। তবে প্রচলিত ওপেন কাট পদ্ধতিতে সেটি সম্ভব হবে না। মাটির গভীরে থাকা শ্বাসমূল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রচুর গাছ মারা পড়বে। বিকল্প হলো শিকড়ের নিচ দিয়ে পাইপলাইন নিয়ে যাওয়া। সেটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সরকার সে পদ্ধতিতে যাবে না ব্যয় সংকোচনের জন্য।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের জনপদ উন্নয়ন বঞ্চিত। এ অঞ্চলের মানুষের উন্নয়ন করতে হলে এখানে শিল্পায়ন করতে হবে। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, বেজা প্রস্তাবিত ইকোনমিক জোন ও সুন্দরবনের পর্যটন—সবকিছু দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রী খুলনা সফর করছেন। তিনি জায়গাটা সচক্ষে দেখলে বিষয়গুলো কানেক্ট করতে পারবেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, এসব করার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই হবে, পরিবেশগত সমীক্ষা হবে। সবকিছু অনুকূল থাকলে এসব বিষয়ে কথা বলার জায়গা তৈরি হবে, তার আগে নয়।

বনের মধ্যে কিছু করতে গেলে যতই বলা হোক প্রভাব পড়বে না, একটা প্রভাব পড়বেই। সুন্দরবন যেহেতু আমাদের বিশ্ব–ঐতিহ্য, তাই সরকারের এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

টার্মিনাল নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করতে কয়েক দফায় সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা, মন্ত্রী ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) চেয়ারম্যান আকরাম পয়েন্ট পরিদর্শন করেছেন। আজ সুন্দরবন পরিদর্শনে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও। এ ছাড়া নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগের কথা গত ১৪ আগস্ট ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেছিলেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম।

এর দুদিন পর ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ; নৌপরিবহন, সড়ক, সেতু ও রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, বেজা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বঙ্গোপসাগরের আকরাম পয়েন্ট, শিবসা নদী, সুন্দরবন ও মোংলা বন্দর পরিদর্শন করে। ওই প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ছিলেন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানও।

পরিদর্শন শেষে ওই দিন বিকেলে মোংলা বন্দর বাসস্ট্যান্ডে পৌর বিএনপি আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ রবিউল আলম বলেন, মোংলা বন্দরের আকরাম পয়েন্টে ভাসমান এলএনজি স্টেশন করা হবে। সেখান থেকে ২৩ কিলোমিটার পাইপলাইন টেনে গ্যাস মোংলায় আনা হবে। এরপর সেই গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বনের মধ্যে কিছু করতে গেলে যতই বলা হোক প্রভাব পড়বে না, একটা প্রভাব পড়বেই। সুন্দরবন যেহেতু আমাদের বিশ্ব–ঐতিহ্য, তাই সরকারের এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।’

ফিরোজ আহমেদ বলেন, গ্যাস যেহেতু একটি দাহ্য পদার্থ, তাই দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দুর্ঘটনা ঘটলে সেটার প্রভাব পড়বে সুন্দরবনে। এর আগে জাহাজ থেকে তেল নিঃসরণের ঘটনা ঘটেছে। টার্মিনাল হলে জাহাজ চলাচল বাড়বে। তেল চুইয়ে পড়া বা নিঃসরণের ঘটনাও ঘটবে। জাহাজ চলাচল যত বাড়বে, দূষণও তত বাড়বে।

আকরাম পয়েন্টটি দক্ষিণ অভয়ারণ্য এলাকার কাছেই অবস্থিত। আকরাম পয়েন্টের দুই পাশে অভয়ারণ্য এলাকা থাকায় সেখানে টার্মিনাল করা হলে এই অনন্য ম্যানগ্রোভ বনের বাস্তুতন্ত্রের উদ্ভিদ, প্রাণিকুল এবং সামগ্রিক প্রতিবেশের ওপর ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে।

সুন্দরবন সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের আইনি কর্তৃপক্ষ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন বন অধিদপ্তর। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে টার্মিনালের সম্ভাব্য স্থানটি পরিদর্শন করা হলেও বন অধিদপ্তরকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

জানতে চাইলে বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, টার্মিনাল নির্মাণ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কিছু জানানো হয়নি। এর বাইরে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে বিভিন্ন মাধ্যমে টার্মিনাল নির্মাণের কথা জানতে পেরে খুলনা বন সংরক্ষকের কার্যালয় থেকে বন অধিদপ্তরে উদ্বেগ জানিয়ে সম্প্রতি একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে, সুন্দরবনের বিশ্ব–ঐতিহ্য এলাকায় আকরাম পয়েন্টে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হবে। ওই টার্মিনালে গভীর সমুদ্র থেকে পাইপের মাধ্যমে ক্ষতিকর এলএনজি গ্যাস সরবরাহ করা হবে।

আকরাম পয়েন্টটি দক্ষিণ অভয়ারণ্য এলাকার কাছেই অবস্থিত। আকরাম পয়েন্টের দুই পাশে অভয়ারণ্য এলাকা থাকায় সেখানে টার্মিনাল করা হলে এই অনন্য ম্যানগ্রোভ বনের বাস্তুতন্ত্রের উদ্ভিদ, প্রাণিকুল এবং সামগ্রিক প্রতিবেশের ওপর ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে।

সুন্দরী, গরান ও গেওয়াগাছ শ্বাস নিতে না পেরে মারা যাবে। এর বাইরে জাহাজ থেকে পড়া পোড়া তেল, রাসায়নিক বর্জ্য বনের মাটিতে এসে প্রাকৃতিকভাবে চারা জন্মানোর প্রক্রিয়া চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বিশাল আকৃতির এলএনজি ট্যাংকার ও জাহাজ চলাচলের কারণে তীব্র শব্দ ও কম্পন তৈরি হবে জানিয়ে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এর ফলে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা ইরাবতী ও গাঙেয় ডলফিন তাদের আবাসস্থল হারাবে। এসব জাহাজ ও ট্যাংকারের প্রপেলারের আঘাতে মারা পড়বে এসব জলজ প্রাণী।

এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তরিত করার সময় প্রচুর পরিমাণে ঠান্ডা বা গরম পানি নদীতে ফেলতে হবে। এর ফলে নদীর পানির তাপমাত্রায় পরিবর্তন হয়ে সালোক–সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। এতে মাছের ডিম ও পোনা নষ্ট হবে। আকরাম পয়েন্ট ও আশপাশের বনাঞ্চল বাঘসহ অন্য বন্য প্রাণীদের অবাধ বিচরণের জায়গা। টার্মিনাল নির্মাণের কার্যক্রম, কৃত্রিম আলো শিল্প কর্মকাণ্ডের ফলে বাঘ, চিত্রা হরিণ ও বন্যশূকরের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণ বাধাগ্রস্ত হবে। ম্যানগ্রোভ বনের কাদাচর অসংখ্য পরিযায়ী পাখি ও উভচর প্রাণীর আবাস। টার্মিনাল নির্মাণের ফলে এসব কাদাচর নষ্ট হয়ে এদের বাসস্থান নষ্ট হবে।

চিঠিতে অন্যতম উদ্বেগ আছে সুন্দরীসহ সুন্দরবনের অন্যান্য ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ নিয়ে। আকরাম বা নলিয়ানে টার্মিনাল হলে জাহাজ চলাচলের সুবিধার্থে এখানে নিয়মিত খননকাজ করে যেতে হবে। এর ফলে নদীর তলদেশে জমা হওয়া শিল্পকারখানা ভারী ধাতু নদীর পানিতে মিশে যাবে এবং ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূল পলির নিচে ঢাকা পড়ে যাবে। এর ফলে সুন্দরী, গরান ও গেওয়াগাছ শ্বাস নিতে না পেরে মারা যাবে। এর বাইরে জাহাজ থেকে পড়া পোড়া তেল, রাসায়নিক বর্জ্য বনের মাটিতে এসে প্রাকৃতিকভাবে চারা জন্মানোর প্রক্রিয়া চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের তীব্র বিরোধিতা করে ইউনেস্কো। একপর্যায়ে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে সুন্দরবনকে ঝুঁকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করে।

২০১৪ সাল থেকে সুন্দরবনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসছে ইউনেসকো। বিশ্ব–ঐতিহ্য এলাকার সর্বশেষ অবস্থা জানতে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে বিশ্ব–ঐতিহ্য কমিটির সর্বশেষ সভা হয় গত ২১ জুলাই। ১০ দিনের এ সভায় সুন্দরবন নিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিশ্ব–ঐতিহ্য এলাকাগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি বুঝতে বিশ্ব–ঐতিহ্য কমিটিকে কারিগরি সহায়তা দেয় ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার। তাদের প্রতিবেদনে ২০১৯ সালে ইউনেসকো ও প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের যৌথ মিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের হালনাগাদ তথ্য চেয়েছিল বাংলাদেশ প্রতিনিধির কাছে।

যৌথ মিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সুন্দরবনসহ দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের জন্য কৌশলগত পরিবেশগত মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত করে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার সে মূল্যায়নে সুন্দরবন নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করার কথা বলা হলেও সেটি না করায় বাংলাদেশের সমালোচনা করে।

ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টারের খসড়া প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আগামী ২০ বছরে সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ যেসব হুমকি চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলো এড়াতে কৌশলগত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার তাগিদ দিয়েছে সেন্টার। এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা অনুযায়ী, সুন্দরবনের ওপর প্রভাব কী কী পড়ছে, সেটার অতিরিক্ত গবেষণা ও উপাত্ত সংগ্রহের ওপর জোর দেওয়া হয়।

ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার সুন্দরবনের আশপাশে বৃহৎ শিল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সুন্দরবনের অসাধারণ সর্বজনীন মূল্য রক্ষায় বিশ্ব–ঐতিহ্যের নির্দেশিকা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করে। সুন্দরবন সংরক্ষণ অবস্থার ওপর ২০২৭ সালের ১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে বাংলাদেশকে।

তবে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির সভায় এসব সুপারিশ সংশোধনের প্রস্তাব দেয় আজারবাইজান। সে প্রস্তাবের আলোকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুন্দরবনের ওপর প্রতিবেদন দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।

এদিকে ১৬ অক্টোবর বাকুতে আজারবাইজানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেহুন বাইরামভের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাক্ষাৎ করেন। এ সময় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে আজারবাইজান।

পরিবেশ ও বনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সিদ্ধান্তে বিশ্ব-ঐতিহ্যের তালিকা থেকে সুন্দরবনকে সরিয়ে নিতে পারে ইউনেসকো। মোংলাকেন্দ্রিক শিল্পকারখানা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণে সুন্দরবনে বন্য প্রাণী ও বাস্তুতন্ত্র ইতিমধ্যে নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছে। তাঁরা মনে করছেন, এমন পরিস্থিতিতে এ ধরনের জ্বালানি অবকাঠামো সুন্দরবনকে আরও ঝুঁকিতে ফেলবে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের তীব্র বিরোধিতা করে ইউনেস্কো। একপর্যায়ে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে সুন্দরবনকে ঝুঁকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করে।

২০১৪ সালে দোহায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৩৮তম সভায় রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আশপাশের শিল্পায়ন নিয়ে উদ্বেগ জানায় তারা। কমিটির সিদ্ধান্তে বলা হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে সুন্দরবনের ওপর সম্ভাব্য পরোক্ষ প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, তা পরিষ্কার নয়। আশপাশে অন্যান্য শিল্প ও অবকাঠামো গড়ে ওঠা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় দোহার সভায়।

ওই সময় সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রের সকল তথ্য–উপাত্ত ইউনেসকোর কাছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও বিদ্যুৎকেন্দ্র সরিয়ে না নেওয়ার বিষয়ে অনড় থাকে। এরপর ২০১৮ সালে ইউনেসকোর সভায় সুন্দরবন নিয়ে কৌশলগত পরিবেশ প্রভাব সমীক্ষা করার আগে শিল্পকারখানার অনুমোদন না দিতে সরকারকে সতর্ক করা হয়।

২০১৬ সালের ২২ থেকে ২৮ মার্চ ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র ও প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন যৌথ পর্যবেক্ষক দল সুন্দরবন পরিদর্শন করে। ওই বছরের ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত মূল্যায়নে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সুন্দরবনের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে প্রকল্পটি বাতিল করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

ওই সময় ইউনেসকোর মূল্যায়ন ছিল, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য পরিবেশগত যে সমীক্ষা তৎকালীন সরকার করেছিল, তাতে সুন্দরবনের জন্য যে যে ঝুঁকি তৈরি হবে সেটা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

ওই সময় সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রের সকল তথ্য–উপাত্ত ইউনেসকোর কাছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও বিদ্যুৎকেন্দ্র সরিয়ে না নেওয়ার বিষয়ে অনড় থাকে। এরপর ২০১৮ সালে ইউনেসকোর সভায় সুন্দরবন নিয়ে কৌশলগত পরিবেশ প্রভাব সমীক্ষা করার আগে শিল্পকারখানার অনুমোদন না দিতে সরকারকে সতর্ক করা হয়।