রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার গোবিন্দপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) এক সদস্যের কাছ থেকে প্রতিবন্ধী ভাতার ১২টি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ওই ইউনিয়নের মাড়িয়া মোড়ে অবস্থিত এক বিকাশ এজেন্টের দোকানে ভাতার টাকা তুলতে গিয়ে তিনি স্থানীয় এলাকাবাসীর হাতে আটক হন। এ সময় তাঁকে মারধরের পাশাপাশি উদ্ধারকৃত সিম কার্ডগুলো ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

আটক ব্যক্তির নাম শহিদুল ইসলাম। তিনি গোবিন্দপাড়া ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ উঠেছে, তিনি প্রতিবন্ধী সেজে নিজের নামের পাশাপাশি বাবা, বোন ও ভগ্নিপতিদের নাম ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তদন্তেও এই তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে।

শহিদুল ইসলামের দাবি, তাঁরসহ বাবা, ভাই ও ভাতিজির নাম প্রতিবন্ধী তালিকায় রয়েছে এবং ইউপি চেয়ারম্যানই এটি করে দিয়েছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, আজ ইউপি চেয়ারম্যানের লোকজন তাঁকে মারধর করে ভাতার ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা কেড়ে নিয়েছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গোবিন্দপাড়া ইউনিয়নের মাড়িয়া মোড়ের বিকাশ এজেন্ট এনামুল হকের দোকানে ভাতার টাকা তুলতে যান ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম। সেখানে তিনি বিভিন্ন অপারেটরের ১০টি সিম কার্ড বিকাশ এজেন্টের কাছে জমা দেন। বাকি দুটি সিম কার্ড তাঁর নিজের মুঠোফোনে লাগানো ছিল। একসঙ্গে এতগুলো সিম থেকে টাকা তোলার চেষ্টা দেখে উপস্থিত লোকজনের সন্দেহ হয়। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শহিদুলের সঙ্গে তাঁদের বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তাঁকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে দোকানের বাইরে নিয়ে আসা হয়। এই সময় শহিদুলের পক্ষের লোকজন সেখানে উপস্থিত হলে উভয় পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান স্থানীয় হাট গাঙ্গোপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের পুলিশ সদস্যরা। তদন্তকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মাকসুদ রুপক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বিশৃঙ্খলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পর উপস্থিত লোকজনের কাছ থেকে ইউপি সদস্যকে উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁর কাছে থাকা ১২টি সিম কার্ডের মধ্যে ১০টি জব্দ করে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া হয়।”

ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁরসহ বাবা, ভাই, ভাতিজির নাম প্রতিবন্ধী তালিকায় আছে। ইউপি চেয়ারম্যান সেটি করে দিয়েছেন। আজ ইউপি চেয়ারম্যানের লোকজন তাঁকে মারধর করে ভাতার ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা কেড়ে নিয়েছেন। কেন এমন করা হলো তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এবার চিয়ারমেন পদে ভুট করবের চাইছি। তাই ষড়যন্ত্র করি এই কাজ করিছে।”

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকার বর্তমানে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি মাসে এক হাজার টাকা হারে ভাতা প্রদান করে। এই অর্থ প্রতি তিন মাস অন্তর সংশ্লিষ্ট ভাতাভোগীর বিকাশ হিসাব নম্বরে জমা করা হয়। বিকাশ এজেন্ট এনামুল হক জানান, ওই ইউপি সদস্য ভাতার টাকা ওঠাতে চেয়েছিলেন এবং ১০টি সিম কার্ড দিয়েছিলেন; কিন্তু ঝামেলা সৃষ্টি হওয়ায় তিনি টাকা তুলতে পারেননি।

তদন্তের পর জানা গেছে, ওই ইউপি সদস্য নিজেসহ স্বজনদের নামে অবৈধভাবে ভাতা নিচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে সিমগুলোতে ভাতার টাকা ঢুকে যাওয়ায় তাৎক্ষণিক কিছু করা সম্ভব হয়নি, তবে ভবিষ্যতে ওই ইউপি সদস্য আর ভাতার টাকা পাবেন না বলে জানানো হয়েছে।

গোবিন্দপাড়া ইউপির চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিগত সরকারের সময় থেকে ওই ইউপি সদস্য ১২ জনকে প্রতিবন্ধী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ভাতার টাকা আত্মসাৎ করে আসছেন। সিমগুলো নিজের ও স্বজনদের নামে নিবন্ধিত। কয়েক দিন আগে ভাতার টাকা এসেছে এবং আজ টাকা তুলতে গিয়ে তিনি এলাকাবাসীর হাতে আটক হন।

প্রতিবন্ধী কার্ড করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যানের ভাষ্য, সাধারণত ভাতাভোগীর বরাদ্দ সংখ্যা আসার পর ইউপি সদস্যদের মধ্যে তা বণ্টন করে দেওয়া হয়। পরে তাঁরা যাচাই–বাছাই করে তালিকা তৈরি করেন। এখানে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই। টাকা কেড়ে নেওয়ার বিষয়ে হাবিবুর রহমান বলেন, কোনো টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি জানেন না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পরামর্শে সিমগুলো নিজের কাছে রেখেছেন।

বাগমারা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মতিনুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আজকের ঘটনাটি তিনি জানেন না। তিনি যোগদান করার পর জানতে পারেন, ওই ইউপি সদস্য নিজেসহ স্বজনদের নামে ভাতা নিচ্ছেন। তদন্তের পর ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে সিমগুলোতে ভাতার টাকা ঢুকে যাওয়ায় কিছু করা যায়নি। ভবিষ্যতে ওই ইউপি সদস্য আর ভাতার টাকা পাবেন না। তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হবে।”