দারিদ্র্যের সাথে লড়াই আর মানসিক অসুস্থতার চরম যন্ত্রণা—এই দুই সংকটের মাঝে জীবন অতিবাহিত করছেন কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের গাবুর হেলান গ্রামের একটি পরিবারের সদস্যরা। স্বামী-স্ত্রীসহ পরিবারের মোট ছয়জন সদস্যই মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় তারা অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
সরেজমিনে জানা গেছে, পরিবারের প্রধান রঞ্জন (৬৫), যাকে স্থানীয়রা 'রঞ্জন পাগলা' হিসেবে চেনেন। তিনি জন্ম থেকেই মানসিক ভারসাম্যহীন। তাদের চার সন্তান—রনজি খাতুন (৩০), দেলোয়ার (২৩), অধিফা খাতুন (২০) এবং দানিয়েল (১৭)—সবার মধ্যেই একই ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা গেছে। এছাড়া রঞ্জনের স্ত্রী দোলেনা বেগমও (৫৫) আংশিক মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন।
এই পরিবারে উপার্জনের মতো সুস্থ কোনো সদস্য নেই। তাদের নিজস্ব কোনো জমিজমা বা আয়ের স্থায়ী উৎসও নেই। অন্যের জমিতে নির্মিত একটি জরাজীর্ণ ঘরে তারা কোনোমতে আশ্রয় নিয়েছেন। সারাদিন নিজেদের মধ্যে ঝগড়া, গালিগালাজ এবং অস্থিরতার মধ্য দিয়েই কাটে তাদের সময়। পুরো সংসারের একমাত্র ভরসা দোলেনা বেগম। নিজের অসুস্থতা থাকা সত্ত্বেও অন্যের বাড়িতে কাজ করে যে সামান্য অর্থ পান, তা দিয়েই কোনোমতে সংসারটি টেনে নিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি প্রতি তিন মাস অন্তর পাওয়া প্রতিবন্ধী ভাতার সামান্য টাকাই বর্তমানে তাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।
নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে দোলেনা বেগম বলেন, “গরিব ঘরের সন্তান আমি। পাগলা মানুষের সাথে পরিবার বিয়ে দিছে। স্বামী কোনো কাজ করতে পারে না। আমি কষ্ট করে চারটা সন্তান বড় করেছি। ওরা সবাই অসুস্থ। ঠিকমতো খাইতে পারি না, খুব কষ্টে আছি।”
স্থানীয় বাসিন্দা শামসুন্নাহার বেগম বলেন, “স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে সবাই অসুস্থ। দোলেনা মানুষের বাড়িতে কাজ করে কোনোভাবে সংসার চালান। সরকারিভাবে সহায়তা পেলে তারা একটু ভালোভাবে বাঁচতে পারতেন।”
কামরুজ্জামান নামের অপর এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, পরিবারটি অত্যন্ত অসহায়। সবাই মানসিক ভারসাম্যহীন এবং তাদের নিজস্ব কোনো জমি নেই, অন্যের জমিতেই তারা বসবাস করেন। তিনি মনে করেন, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা এগিয়ে এসে সহযোগিতা করলে এই পরিবারটি অনেক উপকৃত হতো।
এই বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান জানান, পরিবারটির সকল সদস্যই সরকারি ভাতার আওতায় রয়েছেন। সরকারিভাবে কোনো নতুন সুযোগ-সুবিধা আসলে তা তাদের প্রদান করা হয়।
অন্যদিকে, কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস জানান, পরিবারটির বিষয়ে তার আগে জানা নেই। তবে তারা যদি হাসপাতালের কাছে আসেন, তবে চিকিৎসার বিষয়ে সহায়তা করা সম্ভব হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলে হয়তো পরিবারের কেউ কেউ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।