সকাল ৮টা। অফিসের পথে বাসে বসে নুসরাত (ছদ্মনাম) হঠাৎ খেয়াল করলেন, তাঁর সহকর্মীর গলায় ঝোলানো ছোট্ট একটা পেনডেন্ট বা লকেট, যেটা আসলে কোনো গয়না নয়। ‘এটা কী?’ জিজ্ঞেস করতেই সহকর্মী হেসে বললেন, ‘এটা সারাক্ষণ শুনছে আমার আশেপাশের কথাবার্তা, আর দিনশেষে নিজে থেকেই একটা সারাংশ লিখে দেয়। কোন সভায় কী বলা হলো, কাকে কী প্রতিশ্রুতি দিলাম, সব।’ নুসরাত কিছুটা অবাক, কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে ভাবলেন, "তাহলে তো এই যন্ত্র আমার কথাও শুনছে, অথচ আমার সম্মতিই নেয়নি।"

প্রযুক্তি দুনিয়ার নতুন এই প্রবণতাটি হলো পরিধানযোগ্য এআই বা ওয়্যারেবল এআই। বিশ্বের নামী প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন স্মার্টফোনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে এমন সব যন্ত্রে বিনিয়োগ করছে, যা সারাক্ষণ শরীরে পরিধান করা থাকবে এবং চারপাশের কথোপকথন বিশ্লেষণ করে ব্যবহারকারীকে সরাসরি সহায়তা করবে। একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান চলতি বছরেই প্রায় এক কোটি এমন ডিভাইস বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি তাদের নতুন স্মার্ট চশমার সিরিজও বাজারে আসছে; এরই মধ্যে বেশ কিছু মডেল বাজারে এসেছে এবং আগামী কয়েক মাসে আরও তিন-চারটি মডেল আসার কথা রয়েছে। শুধু এই একটি প্রতিষ্ঠানই গত বছর প্রায় ৭০ লাখ স্মার্ট চশমা বিক্রি করেছে, যা প্রমাণ করে এই বাজারটি কতটা দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

স্মার্টফোনে টাইপ করে প্রশ্ন করার সনাতন পদ্ধতির বদলে এই ডিভাইসগুলো সরাসরি কথা বা ইশারায় কমান্ড গ্রহণ করে। এর ফলে ব্যবহারকারী পুরো দিনটাই এআইয়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবেন—কথা বলে, দৃশ্য দেখিয়ে, এমনকি চোখের ইশারায়। সভার সারাংশ তৈরি, কাজের তালিকা প্রস্তুত করা, এমনকি হারিয়ে যাওয়া তথ্য খুঁজে বের করা—সবই এখন সম্ভব গলায় ঝোলানো বা চোখে পরা একটি ছোট্ট যন্ত্রের মাধ্যমে। এমনকি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন বড় পরিসরে এই ডিভাইসগুলো কেনার পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে গ্রাহক সেবার মানোন্নয়নে অনেক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে শতাধিক ডিভাইস কিনে তাদের কর্মীদের হাতে তুলে দিচ্ছে।

তবে এই সুবিধার আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় ঝুঁকি। এই ডিভাইস শুধু ব্যবহারকারীর কথা শোনে না, বরং আশপাশের প্রত্যেকের কথা রেকর্ড করে। যাদের কথা রেকর্ড করা হচ্ছে, তাদের অনেকেই হয়তো জানেনই না যে তাদের ব্যক্তিগত আলাপ কোথাও জমা হচ্ছে।

এর আগে একাধিক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের ডিভাইস বাজারে এনে ব্যর্থ হয়েছে। মূলত ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা রক্ষা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ এবং ডিভাইসের বাস্তব উপযোগিতা প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়ার কারণে এমনটি ঘটেছিল। সারাক্ষণ রেকর্ড হওয়া এই কথোপকথনগুলো কোথায় জমা থাকছে, কতদিন সংরক্ষিত থাকে এবং ভবিষ্যতে সেগুলোর ব্যবহার কীভাবে হবে—তা নিয়ে স্বচ্ছ তথ্যের অভাব অনেক ব্যবহারকারীকেই দ্বিধায় ফেলছে।

অফিস বা পারিবারিক পরিবেশে এমন ডিভাইস পরিধানকারী ব্যক্তি কার্যত চারপাশের সবাইকে না জানিয়েই এক ধরনের নজরদারির অংশ বানিয়ে ফেলছেন। উল্লেখ্য, বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর হার্ডওয়্যার বিভাগ বছরের পর বছর লোকসানের মুখে রয়েছে। ফলে বাজার ধরে রাখার প্রবল চাপে অনেক সময় নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তাড়াহুড়ো করে সামলানো হতে পারে। সুবিধা যতই লোভনীয় হোক, অন্যের অজান্তে কথা রেকর্ড হওয়া মোটেও সামান্য বিষয় নয়।

কয়েক বছর আগে গলায় বা কাপড়ে আটকে রাখা একটি এআই পিন বাজারে এসেছিল, যা সারাক্ষণ তথ্য প্রদান করত। কিন্তু গোপনীয়তা নিয়ে বিতর্ক, অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার সমস্যা এবং ব্যবহারকারীর প্রকৃত চাহিদার সাথে না মেলার কারণে সেই প্রতিষ্ঠানটি বাজার থেকে কার্যত হারিয়ে যায়। তবে এবারের কৌশলটি ভিন্ন। নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ নতুন কিছু তৈরির বদলে জনপ্রিয় পণ্যের ওপর ভিত্তি করে এগোচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি প্রতিষ্ঠান বিখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্মার্ট চশমা বাজারে এনেছে, যাতে মানুষ প্রযুক্তির চেয়ে পণ্যটিকে দৈনন্দিন ফ্যাশনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, বাহ্যিক রূপ বদলালেও গোপনীয়তার মূল সমস্যাটি কি সত্যিই সমাধান হয়েছে, নাকি তা কেবল সুন্দর মোড়কে ঢাকা পড়েছে?

এই প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহারের জন্য কিছু পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে:

১. অফিসে এমন ডিভাইস ব্যবহারের আগে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা যাচাই করুন—কোন তথ্য সংরক্ষিত থাকবে, আর কর্মী চাকরি ছেড়ে দিলে সেই তথ্যের কী হবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

২. অন্যের সঙ্গে কথা বলার সময় ডিভাইসটি রেকর্ড করছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানিয়ে দেওয়াটাই ভদ্রতা এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতাও। সেটি মেনে ব্যবহার করুন।

৩. সংবেদনশীল আলোচনার সময় (পারিবারিক, চিকিৎসা বা আর্থিক বিষয়) ডিভাইসটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

সেদিন বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে নুসরাত সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি যদি এমন কোনো ডিভাইস কেনেন, তবে প্রথমেই বন্ধুদের জানিয়ে রাখবেন, ‘আমার সঙ্গে কথা বললে হয়তো এআই শুনছে আর রেকর্ড করছে, সাবধান।’ কয়েক দিন পর তিনি নিজেও একটি স্মার্ট চশমা কিনলেন, তবে প্রথম শর্ত হিসেবে ঠিক করলেন, কোনো ব্যক্তিগত আলোচনায় বসার আগে সেটি খুলে রাখবেন।

তাহলে এই সারাক্ষণ শোনা যন্ত্রটি কি জীবনের বন্ধু, নাকি আমাদের গোপনীয়তার শত্রু? সম্ভবত দুটোই একসঙ্গে সত্যি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়, বরং প্রশ্নটি হলো—আমরা কাকে কতটা শোনার অনুমতি দিচ্ছি, আর কাকে দিচ্ছি না।