স্মার্ট টিভির মাধ্যমে বিনোদন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের পাশাপাশি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এলজির বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক এক তদন্তে দাবি করা হয়েছে, এলজির কিছু স্মার্ট টিভি ঘরের কথাবার্তা রেকর্ড করতে পারে এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে সেই তথ্য প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে পাঠিয়ে দেয়। এমনকি টিভি ‘স্ট্যান্ডবাই মোডে’ থাকলেও এই প্রক্রিয়া চলতে পারে বলে তদন্তকারীদের দাবি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সহায়তায় ইউটিউব চ্যানেল গেমার্স নেক্সাস ও লেভেল ১ টেকস এই তদন্ত পরিচালনা করে। তদন্তকারীদের মতে, এলজি স্মার্ট টিভি ব্যবহারকারীর দেখা কনটেন্টের পাশাপাশি একই নেটওয়ার্কে যুক্ত অন্যান্য যন্ত্র, আশপাশের ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক এবং মাইক্রোফোনের মাধ্যমে ধারণ করা অডিওর তথ্য সংগ্রহ করে। এই তথ্যগুলো মূলত লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের কাজে ব্যবহৃত হয়। গেমার্স নেক্সাসের প্রধান স্টিভ বার্ক সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসকে বলেন, “একটি টেলিভিশনকে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।” তাঁর মতে, এটি ব্যবহারকারীর গোপনীয়তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।

তদন্তে জানা গেছে, এই তথ্য সংগ্রহের মূল হাতিয়ার হলো ‘অটোমেটিক কনটেন্ট রিকগনিশন’ বা এসিআর প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে টিভি অডিও ও ভিডিওর ছোট অংশ সংগ্রহ করে তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে, ফলে পর্দায় কী দেখা হচ্ছে বা স্পিকারে কী শোনা হচ্ছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অভ্যাস অনুযায়ী প্রোফাইল তৈরি করে বিজ্ঞাপন দেখানো হয়।

তবে এলজি টিভির ভয়েস রিকগনিশন ব্যবস্থা নিয়ে আলাদা অভিযোগ উঠেছে। তদন্তকারীদের দাবি, কোনো ভয়েস কমান্ড শনাক্ত করার পর আরও ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ড পর্যন্ত ‘ট্রিগার উইন্ডো’ সক্রিয় থাকে, যার ফলে ঘরের কথাবার্তা রেকর্ড হয়ে মেমোরিতে সংরক্ষিত হতে পারে। এমনকি ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকলেও অডিও তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব এবং সংযোগ স্থাপিত হলে তা সার্ভারে পাঠানো হয়।

তদন্তে আরও দেখা গেছে, এই টিভিগুলো ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক স্ক্যান করে স্মার্টফোন ও স্মার্টওয়াচের মতো অন্যান্য যন্ত্র শনাক্ত করতে পারে। এলজির তথ্য অনুযায়ী, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিষ্ঠানটি ৩৮ কোটি ৬০ লাখ ‘সেকেন্ডারি ডিভাইস’ শনাক্ত করেছে, যা বিশ্বজুড়ে বিক্রি হওয়া ২১ কোটি ৬০ লাখ স্মার্ট টিভির তুলনায় অনেক বেশি। এলজি অ্যাড সলিউশন্সের ডেটা সলিউশন্স বিভাগের প্রধান জুলিয়ান জিলবারব্র্যান্ড এক বিপণন প্ল্যাটফর্মকে জানান, একটি পরিবারের সদস্য কারা, সেখানে কী কী যন্ত্র রয়েছে এবং তারা কী দেখছেন—সবই এলজির জানা থাকে। এই তথ্য ব্যবহার করে টিভির বিজ্ঞাপনের প্রভাব পরিবারের অন্যান্য মোবাইল ডিভাইসেও ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

এলজি অ্যাড সলিউশন্সের প্রেসিডেন্ট সার্জ মাত্তা এক ভিডিওতে বলেন, “টেলিভিশনের পর্দা যেহেতু এলজির নিয়ন্ত্রণে, তাই টিভির ওপরও তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।” প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা প্রধান জাস্টিন ফ্রমও জানান, নিজস্ব এসিআর তথ্যের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন পর্দায় কী দেখানো হচ্ছে।

স্মার্ট যন্ত্রের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি নতুন নয়। যুক্তরাজ্যের ভোক্তা অধিকার সংস্থা উইচ এর আগে স্মার্ট টিভি, স্পিকার এমনকি এয়ার ফ্রায়ারেও ট্র্যাকার থাকার কথা জানিয়েছিল।

এলজি দাবি করেছে, এসব সুবিধা ব্যবহারকারীর সম্মতির ভিত্তিতে চালু করা হয়। তবে গেমার্স নেক্সাসের অভিযোগ, সম্মতির শর্তাবলি অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল। এসিআর ট্র্যাকিংয়ের জন্য প্রায় ৫০ হাজার শব্দের শর্তাবলি মেনে নিতে হয়, যা পড়তে একজন প্রাপ্তবয়স্কের তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। এছাড়া অ্যাপ ইনস্টলের সময় ‘সিলেক্ট অল’ অপশনটি আগে থেকেই নির্বাচিত থাকে, ফলে ব্যবহারকারী অজান্তেই তথ্য সংগ্রহের অনুমতি দিয়ে ফেলেন।

তদন্তকারীরা এলজির স্মার্ট পণ্য ব্যবহার না করার এবং বর্তমান ব্যবহারকারীদের টিভি ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। স্টিভ বার্ক বলেন, “এলজির তথ্য সংগ্রহের পরিমাণ অত্যন্ত অনুপ্রবেশমূলক।”

তবে এলজি এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। ডেইলি মেইলকে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র বলেন, “সম্প্রতি প্রকাশিত ভিডিওতে এলজি টিভি সম্পর্কে যেসব দাবি করা হয়েছে, সেগুলো সত্য নয়।” এলজির দাবি, রিমোটের ভয়েস বোতাম চাপলে বা ‘হাই এলজি’র মতো ওয়েক ওয়ার্ড শনাক্ত হলেই কেবল ভয়েস ডেটা প্রক্রিয়া করা হয়। এছাড়া নেটওয়ার্কের অন্যান্য ডিভাইস শনাক্ত করার বিষয়টি স্মার্ট হোম সুবিধার অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ব্যবহারকারী ঐচ্ছিক চুক্তিতে সম্মতি না দিলে বিজ্ঞাপনের কাজে এসিআর তথ্য ব্যবহার করা হয় না।