বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) থেকে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন শুভ্র দেবনাথ। তিনি ৪৮তম বিসিএস (বিশেষ) এবং ৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সফল হয়ে সুপারিশের তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন। তবে গত ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে তাঁর নাম নেই। এর আগে ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত ৪৮তম বিসিএস (বিশেষ)-এর গেজেটেও তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

বারবার কেন তাঁকে বাদ দেওয়া হচ্ছে, তার সঠিক কারণ শুভ্র দেবনাথ জানেন না। এমনকি ৪৬তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারেও তিনি পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আশঙ্কা করছেন যে সেখান থেকেও তাঁর নাম বাদ পড়তে পারে। শুভ্র দেবনাথ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কারা আমার সঙ্গে শত্রুতা করছে, কেন করছে, আমি কিছুই জানি না। তবে মেধার মূল্যায়নে আমাকে সরকার বাদ দিতে পারেনি। যেটি হচ্ছে, সেটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’

তিনি আরও জানান, ‘কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা ছিল না। কোনো ফৌজদারি অপরাধও নেই। আমার কোনো অপরাধ কেউ প্রমাণ করতে পারলে নিজে থেকেই সরে যাব।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারি করা ৪৫তম বিসিএসের গেজেটে মোট ১ হাজার ৭০২ জন প্রার্থীকে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে ১১ মাস আগে পিএসসি যখন সুপারিশ করেছিল, তখন সেই তালিকায় ১ হাজার ৮০৭ জনের নাম ছিল। অর্থাৎ গেজেট প্রকাশের পর ১০৫ জন প্রার্থী বাদ পড়েছেন। এর মধ্যে ৪৯ জন শারীরিক পরীক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রমে অংশ নেননি। বাকি ৫৬ জনকে যাচাই-বাছাই বা ভেরিফিকেশনের পর বাদ দেওয়া হয়েছে। এই ৫৬ জনের মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রার্থী রয়েছেন অন্তত ৯ জন।

অন্যদিকে, ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগের জন্য পিএসসি ৬৬৮ জনকে সাময়িকভাবে মনোনয়ন দিলেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে চূড়ান্ত নিয়োগ পেয়েছেন ৬১১ জন। ফলে পিএসসির মনোনীত ৫৭ জনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পায়নি।

মেধার মূল্যায়নে আমাকে সরকার বাদ দিতে পারেনি। যেটা হচ্ছে, সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এদিকে, ১ অক্টোবর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আশ্বস্ত করে বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে বাদ দেওয়া হবে না, এই নিশ্চয়তা সরকার দিচ্ছে।’

৪৫তম বিসিএসের গেজেট থেকে বাদ পড়া প্রার্থীদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, গত শনিবার তারা মোট ৫৬ জন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। ওই স্মারকলিপিতে তাঁদের বাদ পড়ার বিষয়টি পুনরায় বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়। শুভ্র দেবনাথ জানান, প্রতিমন্ত্রী তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন যে, গেজেটে বাদ পড়া প্রার্থীদের কারও সঙ্গে অন্যায় হয়ে থাকলে সরকার তা পুনরায় বিবেচনা করবে। পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রী তাঁদের আলাদাভাবে আবেদন করার পরামর্শ দেন। সেই অনুযায়ী, এই ৫৬ জন প্রার্থী পরদিন রোববার জনপ্রশাসনসচিবের কাছে আলাদা আবেদন জমা দেন এবং তাঁদের বাদ দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান।

নিয়োগ বঞ্চিত এই ৫৬ জন প্রার্থী গত সোমবার দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। মঙ্গলবারও তাঁদের এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকে। আন্দোলনকারীদের একজন মো. মেহেদী হাসান জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হলে আজ বুধবার থেকে তাঁরা আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করবেন।

৪৫তম বিসিএসের গেজেট থেকে বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে অন্তত ৯ জন সনাতন ধর্মাবলম্বী। তাঁরা হলেন— স্বাস্থ্য ক্যাডারের শুভ্র দেবনাথ, কুশল দাস, বুদ্ধদেব কর, সৌরভ মণি সরকার ও সুব্রত তালুকদার; প্রাণিসম্পদ ক্যাডারের শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য নন্দী ও পার্থ সরকার; কৃষি ক্যাডারের চন্দন বিশ্বাস এবং পুলিশ ক্যাডারের চিন্ময় বর্মণ।

পার্থ সরকার ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভেটেরিনারি মেডিসিনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ৪৫তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার আগে ২০২৪ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তিসহ পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেওয়ার আশায় তিনি বিদেশ যাওয়া বাতিল করেন। কিন্তু ১৪ অক্টোবর গেজেট প্রকাশের পর তিনি চরম হতাশায় পড়েন। পার্থ সরকার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘জীবনে কখনো এতটা খারাপ লাগেনি। বিদেশে যাওয়ার সুযোগও হাতছাড়া করেছিলাম। এখন সব গেল। পরিবার ও বন্ধুমহলের সবাই জানতে চায় কী হয়েছে, কেন বাদ পড়লাম। সবাইকে কী উত্তর দেব বুঝতে পারছি না।’

পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী চিন্ময় বর্মণ। তিনি মেধাক্রমে ৭৬তম অবস্থানে ছিলেন। মৎস্যজীবী বাবার সন্তান হিসেবে চরম অভাবের মধ্য দিয়ে বড় হওয়া চিন্ময়ের সুপারিশপ্রাপ্তির খবরে পরিবারে আনন্দের জোয়ার এসেছিল। কিন্তু চূড়ান্ত গেজেটে নাম না থাকায় এখন সবাই ভেঙে পড়েছেন। চিন্ময় বলেন, ‘কার কাছে যাব, কীভাবে পরিবারকে সান্ত্বনা দেব, কিছুই বুঝতে পারছি না। স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মা–বাবা হতাশায়। পূজা তো আর আমাদের নেই। পরিবার এই ট্রমা নিতে পারছে না। সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।’

এইচ এম ফেরদাউস খান নামের একজন প্রার্থী জানান, গেজেট থেকে বাদ পড়ার পর তাঁরা সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা ফেরদাউস ৪৫তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘গেজেট থেকে বাদ পড়ে এখন সমাজ ও পরিবারের কাছেও মুখ দেখাতে পারছি না। সবাই সন্দেহের চোখে দেখছে। যেন সত্যিই কোনো অপরাধ করেছি।’

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মনিরুজ্জামান ৪৫তম বিসিএসের মৎস্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। বাদ পড়ার পর তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমার পরিবার ভেঙে পড়েছে। তারা কখনো ভাবেনি এভাবে বৈষম্যের শিকার হব। আমি তো অন্যায় করিনি। তাহলে কেন শুধু শুধু বাদ পড়লাম। আমরা তো বৈষম্যমুক্ত দেশ চেয়েছিলাম। তাহলে এটা কেমন নীতি হলো।’

মনিরুজ্জামানের মতো বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী এই গেজেট থেকে বাদ পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে কৃষি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত মো. মেহেদী হাসান জানান, কেন তাঁকে বাদ দেওয়া হলো বা তাঁর অপরাধ কী, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি বলেন, ‘কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা ছি না। কোনো ফৌজদারি অপরাধও নেই। আমার কোনো অপরাধ কেউ প্রমাণ করতে পারলে নিজে থেকেই সরে যাব।’