৪৫তম বিসিএসে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) মোট ১ হাজার ৮০৭ জন প্রার্থীকে ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করেছিল। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গেজেটে স্থান পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৭০২ জন। এর ফলে সবকটি ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করা সত্ত্বেও মোট ১০৫ জন প্রার্থী চূড়ান্ত নিয়োগের প্রজ্ঞাপন থেকে বাদ পড়েছেন। সুপারিশের পর এত বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর বাদ পড়ার ঘটনায় ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়।
সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এই ১০৫ জন প্রার্থী বাদ পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ ও তথ্য স্পষ্ট করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাদ পড়া ১০৫ জনের মধ্যে ৪৯ জন প্রার্থী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আইনি নথিপত্র নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দিতে পারেননি। অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় সব নথি সঠিক থাকা সত্ত্বেও পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বাকি ৫৬ জন প্রার্থী নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বর্তমানে সরকার এই বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করছে।
রাজু ভাস্কর্যের সামনে অনশন ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি—
কোনো ধরনের ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড না থাকা সত্ত্বেও গেজেট থেকে বাদ পড়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে রাজপথে আন্দোলনে নামেন বঞ্চিত প্রার্থীরা। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে অনশন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এই অনশন চলাকালীন নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা-কর্মী সন্দেহে পুলিশ চারজন প্রার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে নিয়ে যায়। তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে কোনো অপরাধের প্রমাণ না পাওয়ায় পরদিনই পুলিশ তাঁদের মুক্তি দেয়। আন্দোলনকারী প্রার্থীদের দাবি, তাঁদের এই আন্দোলন সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এবং এটি কেবল মেধার অধিকার আদায়ের লড়াই। রাজু ভাস্কর্য থেকে আটক প্রার্থীরা মুক্তি পাওয়ায় স্বস্তি ফিরলেও, তাঁরা সম্পূরক গেজেট প্রকাশের দাবিতে অনড় রয়েছেন।
চলছে রি-ভেরিফিকেশন, অন্যায় না করার আশ্বাস—
গেজেট বঞ্চিতদের অনিশ্চয়তা দূর করতে সরকার বড় ধরনের স্বস্তির খবর দিয়েছে। বাদ পড়া প্রার্থীরা যাতে কোনো ধরনের অন্যায় বা বৈষম্যের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে স্থায়ী ঠিকানা ধরে রি-ভেরিফিকেশন বা পুনর্নিরীক্ষা প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘১০৫ জন বাদ পড়ার মধ্যে ৪৯ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে পারেননি। বাকি যাঁদের নাম আসেনি, তাঁদের বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে—একজন প্রার্থীও যাতে অন্যায়ভাবে নিয়োগ বঞ্চিত না হন।’
প্রতিমন্ত্রী আরও নিশ্চিত করে জানান, ‘যাঁরা গেজেট থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা ধরে রি-ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া বর্তমানে পুরোদমে চালু রয়েছে। আশা করছি চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই এই যাচাই-বাছাই শেষ হবে। রাজু ভাস্কর্য থেকে যাঁদের নেওয়া হয়েছিল, তাঁদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আইনি কাঠামোর মধ্যে কোনো প্রার্থীকেই অন্যায়ভাবে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হবে না।’
একনজরে ৪৫তম বিসিএস—
২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়, যেখানে মোট ৩ লাখ ৪৬ হাজার প্রার্থী আবেদন করেন। ২০২৩ সালের ১৯ মে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় এবং ৬ জুন ২০২৩ তারিখে এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়, যাতে ১২ হাজার ৭৮৯ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে লিখিত পরীক্ষা সম্পন্ন হয় এবং ২০২৫ সালের জুলাই মাসে মৌখিক পরীক্ষা শুরু হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর পিএসসি ১ হাজার ৮০৭ জনকে ক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ করে। চূড়ান্ত সুপারিশের প্রায় ১১ মাস পর, ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১ হাজার ৭০২ জনের নিয়োগ গেজেট প্রকাশ করে। তিনটি ভিন্ন সরকারের রাজনৈতিক পরিক্রমা অতিক্রম করে প্রায় চার বছর পর ৪৫তম বিসিএসের পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।