কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় অবস্থিত লালন শাহর আখড়াবাড়ি থেকে একটি টাইম বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। এই রহস্যজনক ঘটনার পেছনে কার হাত রয়েছে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্তকারী দল। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যে ব্যাগের ভেতরে বোমাটি রাখা ছিল, সেই ব্যাগের ঠিকানার সূত্র ধরে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যে স্থান থেকে বোমাটি উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানে একজন অস্থায়ী চা বিক্রেতা অবস্থান করছিলেন। তবে ঘটনার পর থেকে ওই ব্যক্তিকে আর দেখা যায়নি। পুলিশ বর্তমানে তদন্তের স্বার্থে তাঁকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।

ফকির লালন শাহর তিরোধান দিবস উপলক্ষে ছেঁউড়িয়ায় তিন দিনব্যাপী এক বিশেষ আয়োজনের কথা ছিল, যা গতকাল সোমবার মধ্যরাতে শেষ হয়। গত রোববার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে আখড়াবাড়ির ভেতরে একটি ব্যাগে বোমা থাকার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত এলাকাটি ঘিরে ফেলে। পরদিন সকালে ঢাকা থেকে আসা পুলিশের স্পেশাল রেসপন্স ইউনিটের (এসআরইউ) বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল এসে বোমাটি নিরাপদ করে।

এই ঘটনার পর আখড়াবাড়িতে আসা ফকির-সাধু এবং দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে গতকাল সকালের মধ্যেই আখড়াবাড়ি প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কুমারখালী থানায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ঘটনাটি তদন্ত করতে মাঠে নেমেছেন কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভেড়ামারা সার্কেল) দেলওয়ার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁদের সাথে ঢাকা থেকে আসা এসআরইউ-এর দুজন কর্মকর্তাও তদন্তে যুক্ত হয়েছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার পর থেকেই তাঁরা বিরতিহীনভাবে কাজ করছেন। অনুষ্ঠান উপলক্ষে আখড়াবাড়িতে স্থাপন করা শতাধিক ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের বডি-অর্ন ৪৫টি ক্যামেরার ফুটেজ অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

সিসিটিভি ক্যামেরার চিত্র ও অন্যান্য প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করে পুলিশের ধারণা, রাত ১০টা থেকে ১২টার মধ্যবর্তী সময়ে কোনো এক মুহূর্তে বোমাটি সেখানে রেখে আসা হয়েছে। পুলিশ আরও জানিয়েছে, বোমাটি যখন উদ্ধার করা হয়, তখন সেটির টাইম চালু অবস্থায় ছিল।

বোমাটি তৈরির সরঞ্জামগুলো জব্দ তালিকায় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি রিচার্জেবল ব্যাটারি, কিছু তার, একটি সার্কিট, দুটি আতশবাজি এবং টিস্যুতে মোড়ানো কিছু দিয়াশলাইয়ের কাঠি। পুলিশ মনে করছে, সার্কিটে নির্ধারিত সময়ে আতশবাজি ফেটে পাশে থাকা পেট্রলের বোতলে আঘাত করতে পারত, যার ফলে মুহূর্তেই ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা ছিল।

পুলিশের ভাষ্যমতে, রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার পর ওই ব্যাগটি দেখে প্রথমে চা বিক্রেতার সন্দেহ হয়, এরপর পুলিশ বিষয়টি জানতে পারে। পুলিশ পৌঁছানোর আগেই কেউ হয়তো ব্যাগটি খোলার চেষ্টা করেছিলেন, যার ফলে তারের সংযোগ আলাদা হয়ে যায় এবং বিস্ফোরণটি আর ঘটেনি। ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ ওই চা বিক্রেতাকে পুলিশ গুরুত্বের সাথে খুঁজছে।

তদন্তকারীদের ধারণা, এই বোমাটি স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয়েছে। লালনের মতাদর্শের বিরোধী কেউ হয়তো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে এমন কাজ করতে চেয়েছিলেন। এছাড়া যে টিস্যু ব্যাগের ভেতর সরঞ্জামগুলো ছিল, সেটি পার্শ্ববর্তী একটি জেলার মিষ্টির দোকানের। সেই সূত্র ধরেও পুলিশ কাজ করছে।

পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কাউকে সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে সিসিটিভি ফুটেজ আরও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং আশা করা হচ্ছে খুব দ্রুতই গুরুত্বপূর্ণ কোনো সূত্র পাওয়া যাবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সেখানে (বোমায়) কোনো স্প্লিন্টার পাওয়া যায়নি। তবে পেট্রলে আগুন ধরাতে এবং তা ছড়িয়ে দিতেই টাইমিং করা হয়েছিল। ভয়াবহ হতো যদি বিস্ফোরণ ঘটত। আগুন আখড়াবাড়ির ভেতরে ছড়িয়ে পড়ত। এতে দগ্ধ হতো মানুষ। হুড়োহুড়িতেও প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল।”