আজ থেকে ৬৪ বছর আগে র্যাচেল কারসন তাঁর কালজয়ী বই সাইলেন্ট স্প্রিং বা নীরব বসন্ত লিখেছিলেন। বইয়ের নাম কেন নীরব বসন্ত হলো? কারণ, তিনি সতর্ক করেছিলেন এমন এক ভবিষ্যতের ব্যাপারে, যেখানে বসন্ত আসবে, কিন্তু পাখি গান গাইবে না, প্রকৃতির নিজস্ব কোনো শব্দ থাকবে না। সবই ধ্বংস হবে মানুষের লালসার ফলে সৃষ্ট বিষনির্ভর কৃষির কারণে।
এমন নয় যে তাঁর আগে পরিবেশের বিপদ নিয়ে কেউ কথা বলেননি। তবে তিনিই প্রথম জোরালোভাবে পরিবেশের ওপর মানুষের আধিপত্য কায়েমের বিপদ এবং করপোরেট কোম্পানি ও সরকারের অতিমুনাফার লোভে রাসায়নিক কীটনাশকের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। র্যাচেল কারসন বলেছিলেন “কীটনাশক একদিন পাখির গান ও নদীতে মাছের লাফালাফি স্তব্ধ করে দেবে।” সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরার ঘটনা তারই প্রমাণ। বিষের কারণে খালের ছোট-বড় মাছ ও রেণু পোনা, সাপ-ব্যাঙ, পোকামাকড়—সবই মারা যায়। থেমে যায় নদীতে মাছের দাপাদাপি।
আমাদের রাষ্ট্র ও নাগরিকেরা কি সেদিকে নজর দিচ্ছে? নাকি লোকদেখানো পদক্ষেপের আড়ালে অলস বসে রবীন্দ্রনাথের ‘মায়ার খেলা’ গীতিনাট্যের সেই গান গাইছে, “আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান।/ প্রাণের আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণ।”
অথচ এসব ঘটনা কারও অজানা নয়। বহু বছর ধরেই চলছে। এ নিয়ে মুক্তকণ্ঠ-য় ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ সালে ‘বিষের বিপদে “রক্ষক” সুন্দরবন’ শিরোনামে সাত মাসের অনুসন্ধানের পর দীর্ঘ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। নিজেও মুক্তকণ্ঠ-য় মতামত লিখেছি। কিন্তু আগের মতোই বিষে নীল হচ্ছে সুন্দরবন। সমাধান আটকে আছে উদ্যোগের অভাব আর আইনি জটিলতায়।
১১ অক্টোবর মোংলায় মুক্তকণ্ঠ আয়োজিত এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগগুলোর কর্মকর্তা, গবেষক, বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও বনজীবী মানুষ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে উপকূলে পানির সংকট ও সুন্দরবনের প্রতিবেশ নিয়ে বহুমুখী আলোচনা হয়েছে। বিষ দিয়ে মাছ ধরার ফলে বনের প্রতিবেশ যে ভয়াবহ হুমকির মুখে, তা নিয়েও অনেক আক্ষেপ আমরা শুনেছি।
বাংলাদেশে ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের অপব্যবহার বন্ধে ২০১৮ সালের বালাইনাশক (পেস্টিসাইডস) আইন মূল বর্ম। এ ছাড়া ১৯৮৫ সালের বালাইনাশক রুলস (সংশোধিত ২০১০), ১৯৯৫ সালের বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং ২০১৩ সালের নিরাপদ খাদ্য আইন প্রয়োগ করা যায়। নতুন করে ২০০৯ সালের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন সংশোধন করা হচ্ছে। এ বিধানের পরিধি বাড়িয়ে মানুষ ছাড়াও গবাদিপশু, মৎস্য বা অন্য কোনো প্রাণীর জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে সরকার। ১২ অক্টোবর সুন্দরবনে গিয়ে কথা হয় বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক দীপন চন্দ্র দাসের সঙ্গে। তিনি দেখালেন কোন খালগুলোতে বিষ দিয়ে মাছ ধরা হয়।
অর্থাৎ আমাদের আইন আছে, অপরাধের জায়গাগুলো চিহ্নিত, বন বিভাগের অভিযানে অপরাধী ধরাও পড়ছে। কিন্তু সমাধান আটকে আছে খুবই অদ্ভুত অজুহাতে। বিষ দিয়ে যে মাছ ধরা হচ্ছে, তা আদালতে প্রমাণ করা যাচ্ছে না। কারণ, বন বিভাগের নিজস্ব পরীক্ষাগার নেই। বিষয়টা দাঁড়িয়েছে নিজের ছায়ার মতো; দেখা যায়, ছোঁয়া যায় না।
মুক্তকণ্ঠ ১১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার ঘটনায় ৩৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩৭ জনকে। গ্রেপ্তার হয়েছেন ২৫ জন।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমানের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, অভিযুক্তদের অধিকাংশই জামিনে বের হয়ে গেছে। কারণ, বিষ দিয়ে মাছ ধরার ঘটনা আদালতে প্রমাণ করা যায়নি। তিনি বলেন, “নিজেদের পরীক্ষাগার না থাকায় মাছ জব্দের পর নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়। নানা প্রতিষ্ঠান ঘুরে পরীক্ষা শেষ করতে অনেক দিন সময় চলে যায়। তত দিনে মাছের নমুনায় বিষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।” তিনি আরও বলেন, “বিষ প্রয়োগে ধরা মাছ শনাক্তের জন্য কিট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বছর দুয়েক আগে। তবে এখনো তেমন অগ্রগতি নেই।” মুক্তকণ্ঠ আয়োজিত আলোচনা সভায় উপস্থিত থেকে একই কথা বলেছেন বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ।
কয়েক দিন আগে সুন্দরবন গিয়ে স্থানীয় মানুষ ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, স্থানীয়ভাবে তারা চাইলেও ওপর থেকে সাড়া পেতে সময় লেগে যায় অনেক। বন বিভাগের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের অভিযোগের কথা আগেও শুনেছি, এবারও শুনলাম। কিন্তু অনেক কর্মকর্তা আছেন, যাঁরা সত্যিকার অর্থেই ব্যবস্থা নিতে চান। তাঁরাও আটকে যান জনবল ও সম্পদ এবং আইনি জটিলতায়। প্রশ্ন হলো, এত বড় একটা বিপদের কথা জেনেও দ্রুত পরীক্ষা করানোর উদ্যোগ নিতে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এত সময় কেন লাগবে?
অন্যদিকে, বন বিভাগ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অপরাধী ধরছে ঠিকই। কিন্তু ধরা পড়া ব্যক্তিরা বেশির ভাগই সাধারণ জেলে। তাঁদের পেছনে মহাজনদের চক্রটি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া বেশি জরুরি।
র্যাচেল কারসন তাঁর বইয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন, রাসায়নিক কীটনাশক আমাদের সামগ্রিক প্রতিবেশ নীরবে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মানুষ যদি এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে পৃথিবীতে একটা স্থায়ী প্রাণহীন নীরবতা নেমে আসবে। তবে এ সতর্কতা ৬৪ বছর আগের। এত দিনে অনেক কিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে।
কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র ও নাগরিকেরা কি সেদিকে নজর দিচ্ছে? নাকি লোকদেখানো পদক্ষেপের আড়ালে অলস বসে রবীন্দ্রনাথের মায়ার খেলা গীতিনাট্যের সেই গান গাইছে, “আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান।/ প্রাণের আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণ।”
—খলিলউল্লাহ্ লেখক ও সাংবাদিক; মুক্তকণ্ঠ-র জলবায়ু প্রকল্প ব্যবস্থাপক