সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার প্রবণতা বন্ধ করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে বন বিভাগ। এসব অভিযানে বিষের বোতল, জাল, মাছ এবং নৌকা জব্দ করা হলেও আইনি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাব। মামলাগুলো যখন আদালতে পৌঁছায়, তখন প্রশ্ন ওঠে যে জব্দ করা মাছগুলো বিষ প্রয়োগ করেই ধরা হয়েছে—তার অকাট্য প্রমাণ কী?

সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরার একাধিক ঘটনায় বন বিভাগের কর্মকর্তারা আদালতে বারবার এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। দ্রুত নমুনা পরীক্ষার কোনো সুযোগ না থাকায় মাছের শরীরে বিষের উপস্থিতি এবং বিষ প্রয়োগের বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।

সাতক্ষীরা বন আদালতে বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফরেস্টার জিয়াউর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বন বিভাগের নিজস্ব পরীক্ষাগার নেই। নমুনা কোথায় পাঠালে দ্রুত পরীক্ষা করা যাবে, তা নিয়েও জটিলতা রয়েছে। অন্যদিকে বিষসহ অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করলেও রাসায়নিক পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। ফলে আদালতেও বিষয়টি প্রমাণ করা যায় না।”

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের (খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলা) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার ঘটনায় মোট ৩৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৭ জনকে আসামি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৫ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। অভিযানে ৫৯টি বিষের বোতল, বিষ প্রয়োগ করে ধরা ১৬৭ কেজি চিংড়ি ও ১০০ কেজি অন্যান্য মাছ জব্দ করা হয়। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে ৮৯টি নৌকা ও ৭০টি অবৈধ মাছ ধরার জাল জব্দ করেছে বন বিভাগ।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, বিষ দিয়ে মাছ ধরার একটি ঘটনায় মাছ জব্দের পর নমুনা পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (বিসিএসআইআর) পাঠানো হয়েছিল। তবে সেখানে পরীক্ষা করা সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বারি) পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৫ দিন সময় লেগে যায় এবং ততদিনে মাছের নমুনায় বিষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

মুক্তকণ্ঠ খুলনার কয়রা বন আদালতে দায়ের করা বিষ দিয়ে মাছ ধরার ১০টি মামলার নথি পর্যালোচনা করেছে। এতে দেখা গেছে, ঘটনাস্থল থেকে বিষের বোতল, মাছ এবং মাছ ধরার সরঞ্জাম জব্দের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। কোনো মামলায় তিনটি বিষের বোতল ও ১০ কেজি চিংড়ি, আবার কোনো মামলায় চারটি বোতল ও ৯ কেজি চিংড়ি জব্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য একটি ঘটনায় এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি বিষের বোতল ও ৩৮ কেজি চিংড়ি জব্দের বিবরণ পাওয়া গেছে।

সুন্দরবনের একটি টহল ফাঁড়ির কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কিছুদিন আগে বিষের বোতল ও বিষ প্রয়োগ করে ধরা মাছসহ দুজনকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, তাঁর মক্কেল একজন নিরীহ জেলে এবং বন কর্মকর্তারা ঘুষ না পেয়ে তাঁকে ফাঁসিয়েছেন। মাছ বিষ দিয়ে ধরা হয়নি বলেও তিনি আদালতে দাবি করেন। ওই কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন যে, এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি বিষ দিয়ে মাছ ধরার দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়া এক জেলে জামিনে মুক্ত হয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অল্প সময়ে বেশি মাছ ধরার আশায় বিষের ব্যবহার শুরু করেন। সুন্দরবনের খালে কীটনাশক (বিষ) প্রয়োগ করলে মাছ দ্রুত ভেসে ওঠে, যা পরে বাজারে বিক্রি করতেন।

পরিবেশবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, সুন্দরবনের খালে বিষ প্রয়োগ করলে মাছের পাশাপাশি অন্যান্য জলজ প্রাণীও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া বিষ প্রয়োগে ধরা মাছ খেলে মানুষের শরীরেও ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, “বিষাক্ত পানি ভাটার টানে ছড়িয়ে পড়লে জলজ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীদের স্বাভাবিক প্রজননপ্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।”

মাছে বিষের উপস্থিতি শনাক্ত করার জন্য বিশেষ কিট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ২২ আগস্ট খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায় এই উদ্যোগের কথা জানান বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বনসংরক্ষক ইমরান আহমেদ। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এ বিষয়ে কাজ করছে, তবে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।”

ইমরান আহমেদ আরও বলেন, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়া বিষ দিয়ে মাছ ধরার ঘটনা আদালতে প্রমাণ করা কঠিন। পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আইনি সুবিধা পেয়ে যাচ্ছেন।

সুন্দরবনের জলজ সম্পদ নিয়ে কাজ করা একজন গবেষক মুক্তকণ্ঠকে জানান, মাছের প্রজাতি গণনার কাজে গত ছয় মাসে তিনি একাধিকবার কয়রার বাজারে গিয়েছেন। সেখানে তীব্র গন্ধযুক্ত চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছ পাওয়া গেছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ ধরনের মাছের একটি অংশ ট্রাকে করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। তবে শুধু গন্ধ দিয়ে বিষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায় না, এর জন্য সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।

বন আদালতের সাবেক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আজহারুল ইসলাম মনে করেন, বিষ প্রয়োগে মাছ ধরার মতো অপরাধ প্রমাণের জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাব্যবস্থা থাকা জরুরি। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়; অপরাধ প্রমাণের জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ব্যবস্থাও প্রয়োজন। বন অপরাধের মামলায় যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা না গেলে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে।”