২০২২ সালে প্রথমবার কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত হন সামিয়া আফরিন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওই বছরের এপ্রিলে তিনি সিঙ্গাপুরে যান। সেখানে পরীক্ষার পর জানা যায়, ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসায় ইতিবাচক সাড়া পেয়ে তিনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছিলেন। তবে নিয়মিত ফলোআপের সময় জেনেটিক পরীক্ষায় পুনরায় ক্যানসার ধরা পড়ে। এবার তিনি আক্রান্ত হন ওভারিয়ান ক্যানসারে।
ক্যানসারের চিকিৎসায় চুল পড়ে যাওয়ার কষ্ট সামিয়াকে একা বইতে দেননি তাঁর পরিবারের সদস্যরা। কেমোথেরাপির কারণে চুল পড়ে যাবে—চিকিৎসক আগেই এই কথা জানিয়েছিলেন। তাই নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে প্রথমে চুল ছোট করেন সামিয়া, এরপর ছেলে আহানাফ আরাবির হাতে মাথা ন্যাড়া করান। ছেলের এই ভালোবাসায় সাড়া দিয়ে কিছুক্ষণ পর আহানাফ নিজেও মাথা ন্যাড়া করে হাসিমুখে হাজির হয়। স্ত্রীর এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়াতে নিজের মাথার চুল ফেলে দেন স্বামী এস এম রেজাউল ইমরানও। গত ১৫ সেপ্টেম্বর মাথা ন্যাড়া করার একটি ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করে সামিয়া জানান, কেমোথেরাপির কারণে চুল পড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে মন খারাপ না করে তিনি তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর মতে, সবকিছু নিয়ে মন খারাপ করে লাভ নেই; সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারাটাই আসল।
গত বছরের ২০ মার্চ ঢাকার বনানীতে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের সহায়তায় আয়োজিত ‘রিভোগ ওয়্যার টু কেয়ার’ নামের পোশাক প্রদর্শনীতে সামিয়া প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে নিজের অসুস্থতার কথা জানান। এর আগে খুব কাছের মানুষ ছাড়া অনেকেই তাঁর এই লড়াইয়ের কথা জানতেন না।
গত ১১ অক্টোবর রাজধানীর বনানীতে নিজের বাসায় মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেন সামিয়া। তিনি বলেন, “চুল তো মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য। চুল থাকুক বা না থাকুক, আত্মবিশ্বাসটাই মূল। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। হাঁটাচলা করতে পারছি, এটাই অনেক বড় পাওয়া।”
২০২২ সালে প্রথমবার কোলন ক্যানসার ধরা পড়ার পর সিঙ্গাপুরে গিয়ে যখন তিনি জানতে পারেন রোগটি চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপি প্রয়োজন, তখন তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। সামিয়া বলেন, “চিকিৎসক দেবর যখন প্রথম খবরটা দিল, ভেবেছিলাম, যখন হয়েই গেছে, তখন আর কী করা যাবে! সন্ধ্যায় সেজেগুজে দাওয়াত খেতেও গিয়েছি। কিন্তু সিঙ্গাপুরে গিয়ে যখন শুনলাম ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে, অস্ত্রোপচার করতে হবে, কেমোথেরাপি দিতে হবে, তখন ভেঙে পড়ি। অনেক কান্নাকাটি করেছি। মনে হয়েছিল, চিকিৎসা নিলে আমার পুরো জীবনযাপন বদলে যাবে।”
পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরের এক চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি ব্যয়বহুল ইমিউনোথেরাপি শুরু করেন। ২১ দিন অন্তর দেওয়া এই চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তীব্র। প্রথম থেরাপির পর তিনি ঢোক গিলতে পারতেন না এবং ত্বকে প্রচণ্ড চুলকানি হতো। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার সময় তিনি হেঁটে চলাফেরা করলেও ফেরার সময় হুইলচেয়ারের প্রয়োজন পড়েছিল। ২০২৩ সালে দেশে ফেরার পরও নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন তিনি। এক পর্যায়ে পাতলা পায়খানার সমস্যায় ডায়াপার পরে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাঁকে।
সেই যন্ত্রণার তীব্রতা বর্ণনা করতে গিয়ে সামিয়া বলেন, “স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবের সময় যে যন্ত্রণা হয়, অনেকটা সে রকম যন্ত্রণা হতো।” তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যান তিনি। শুরুতে স্বামী ও ননদসহ পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে সিঙ্গাপুরে গেলেও পরে তিনি একাই যাতায়াত শুরু করেন, কারণ পরিবারের অন্যদের কাজ ছিল এবং তিনি নিজেও শক্ত থাকতে চেয়েছিলেন। চিকিৎসায় সাড়া পেয়ে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরছিলেন, কিন্তু জেনেটিক পরীক্ষায় পুনরায় ওভারিয়ান ক্যানসার ধরা পড়ে। গত ২২ জুলাই সিঙ্গাপুরে অস্ত্রোপচারের পর বর্তমানে দেশে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন তিনি। আগামী ডিসেম্বরে ছয়টি কোর্সের চিকিৎসা শেষ হবে। বর্তমান অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে সামিয়া বলেন, “খাবারে স্বাদ-গন্ধ কিছুই পাই না। মুখ লাল হয়ে যায়, মাথা চুলকায়। তবে কাউকে এই যন্ত্রণা বলে বোঝানো যাবে না। যিনি এর মধ্য দিয়ে যাবেন, তিনিই বুঝবেন।”
জেনেটিক পরীক্ষায় শরীরে জিনগত ত্রুটি ধরা পড়ায় ভবিষ্যতে শরীরের অন্য কোথাও ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবুও আশাবাদী সামিয়া। তিনি বলেন, “আশা করছি, শরীরে আর ক্যানসার ফিরে আসবে না।”
বনানীতে স্বামী, দুই ছেলে এবং বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী আবদুর রহিম ও মা জীবন নাহারের সঙ্গে থাকেন সামিয়া। ২৭ বছরের দাম্পত্য জীবনে স্বামী রেজাউল ইমরান এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কাছ থেকে তিনি সবসময়ই সহযোগিতা পেয়েছেন। বড় ছেলে আহানাফ আরাবি, যিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছেন, মায়ের পাশে থাকতে কানাডার পড়াশোনা ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। মায়ের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া এবং নিজের চুল ফেলে দেওয়ার বিষয়ে আহানাফ বলেন, “মাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্যই চুল কেটে দিই। নিজের চুলও কেটে ফেলি। ভালোই লেগেছে। ক্যাম্পাসে গেলে বন্ধুরা চুল ফেলে দেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছে। মায়ের কথা বলার পর সবাই সাপোর্ট করেছে।” মায়ের অসুস্থতা তাঁর জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে তা বোঝাতে গিয়ে আহানাফ বলেন, “যা-ই করি, মাথায় থাকে মায়ের তো ক্যানসার।”
সামিয়া তাঁর ভাইয়ের ছেলে আয়মান আওসাফের আইনি অভিভাবকত্ব নিয়েছেন, যে বর্তমানে ও লেভেলে পড়ছে। সামিয়ার মতে, ক্যানসার চিকিৎসায় শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক চাপ সামলানো অত্যন্ত জরুরি। এই সময়ে পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ও মানসিক সমর্থন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
নিজের অসুস্থতাকে শক্তিতে রূপান্তর করে সামিয়া এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যানসার নিয়ে নিয়মিত লিখছেন। তিনি চান তাঁর অভিজ্ঞতা পড়ে অন্য রোগীরা যেন মানসিক শক্তি পান। এছাড়া তিনি ‘পারপাস বাই সামিয়া’ নামে একটি পডকাস্ট পরিচালনা করছেন এবং উজ্জ্বলা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে ক্যানসার রোগীদের জন্য মেডিক্যাল ক্যাম্প ও তহবিল সংগ্রহের কাজ করছেন। ক্যানসার সচেতনতা ও চিকিৎসা ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে তিনি ভবিষ্যতে আরও কাজ করতে চান। তাঁর ভাষায়, “একসময় ক্যানসারকে অনেক দূরের বিষয় বলে মনে হতো। এখন প্রায় প্রতিটি ঘরেই ক্যানসার ঢুকে যাচ্ছে।”
বর্তমানে কেমোথেরাপি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি উপস্থাপনা বা অন্য কোনো পেশাগত কাজে যুক্ত হতে চান না। গান শোনা, গান গাওয়া, বারান্দার গাছপালার যত্ন নেওয়া এবং তাঁর দুই বিড়ালের সঙ্গে সময় কাটিয়ে দিনগুলো সাজিয়ে নিচ্ছেন তিনি।
মেয়ের অসুস্থতায় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন বাবা আবদুর রহিম। চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “ক্যানসারের চিকিৎসাটা অনেক ব্যয়বহুল। মেয়ের জন্য আমাদের যে কষ্ট, সেই কষ্টটা নিজেদের মধ্যেই রাখি। সবার কাছে আমার মেয়ের জন্য দোয়া চাই।”
পরিবারে চাচা ও ফুফুসহ একাধিক স্বজনকে ক্যানসারে হারিয়েছেন সামিয়া। পরিবারের সামনে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করেন তিনি। সামিয়া বলেন, “আমি অসুস্থ, এটা মানসিকভাবে কখনোই ভাবতে চাই না। বাবা, মা বা স্বামীর সামনে আরও বেশি শক্ত থাকার চেষ্টা করি। দেখা যায়, তাঁরা এসে উল্টো কান্নাকাটি করছেন। তবে আমি ভালো আছি, শক্ত আছি—এটা প্রমাণ করাটাও অনেক কঠিন কাজ।”
নিজেকে মানসিক প্রশান্তি দিতে ১৩ অক্টোবর থাইল্যান্ডে ঘুরতে যান সামিয়া, যেখান থেকে ২৩ অক্টোবর দেশে ফেরার কথা। এরপর ২৫ অক্টোবর তাঁর পরবর্তী কেমোথেরাপি শুরু হবে। অসুস্থতা যেন তাঁর পুরো পরিচয় হয়ে না দাঁড়ায়, সেই চেষ্টাতেই তিনি জীবনকে নতুন করে গুছিয়ে নিচ্ছেন।